বাঙ্গালহালিয়া-শিলক খালের তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি

কামরুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি: রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বাঙ্গালহালিয়া খালের বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বসতভিটা, ফসলি জমিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অসংখ্য ঘরবাড়ি ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। খালের বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই এই ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত সিসি ব্লক স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের বাঙ্গালহালিয়া পাড়া, ৭নং ওয়ার্ডের পূর্ব খুরুশিয়া ফকিরটিলা, ৫নং ওয়ার্ডের জয়নগর, খালছিড়া, হরিহর ও জমাদার টিলার উত্তর পাশে শিলক খালের তীব্র ভাঙন চলছে। ইতিপূর্বে যত্রতত্র অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে পড়েছে। এছাড়া একই ইউনিয়নের সুখবিলাস বাঙালহালিয়া খালেও ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে আশেপাশের বিভিন্ন স্থাপনা। এই খালের উপর নির্মিত একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সেতু দিয়ে স্থানীয়দের প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি এলাকার সড়কগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা দিদার আলম জানান, খালছিড়া এলাকায় অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ফসলি জমি, কবরস্থান এবং জনগুরুত্বপূর্ণ ‘রাজারহাট-সারাশিয়া-হরিহর-সাপলেজা’ আরএইচডি সংযোগ সড়কটি বিলীন হতে চলেছে। এই সড়কটি সম্পূর্ণ ভেঙে গেলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সারাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

সমাজকর্মী মো. মহিউদ্দিন সিদ্দিকী মুন্না জানান, সুখবিলাস বাঙালহালিয়া খালের ভাঙনে ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির ও সড়কসহ জনগুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আলিফ লাম মীম জামে মসজিদ, ইদ্রিস মাস্টার বাড়ি, পরীর বাপের বাড়ি, কবরস্থান সড়ক, বড়ুয়াপাড়া ও পূর্বপাড়া এলাকা এখন তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে।

শহীদুল্লাহ নামে আরেক বাসিন্দা জানান, বাঙালহালিয়া খালের ভাঙন থেকে সড়ক রক্ষা করতে স্থানীয়রা নিজেদের অর্থায়নে কয়েকটি স্থানে বল্লি গেড়ে বালুর বস্তা ফেলেছেন। কাঠ দিয়ে সাঁকো বানিয়ে সাময়িক চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় এলাকা পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী এখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণ ও ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে খালের ভাঙন রোধ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

স্থানীয় সুকান্ত বড়ুয়া বলেন, “পদুয়ার সোমবাইজ্জা হাট থেকে শুরু করে শত শত পরিবারের চলাচলের একমাত্র মূল সড়কটি বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ইদ্রিস মাস্টার বাড়ি হয়ে বাঙালহালিয়া বাজারে গিয়ে মিলেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিসহ এলাকার কোনো রাস্তায় এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। খালের তীব্র ভাঙনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চরম ঝুঁকি নিয়ে এই কাঠের সেতু পার হয়ে সুখবিলাস স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে।” উন্নয়নবঞ্চিত পদুয়ার বাঙালহালিয়া পূর্ব পাড়া এলাকাটির দিকে নজর দেওয়ার জন্য তিনি সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোরশেদ জানান, শিলক খালের ভাঙনের কবলে পড়ে ইতিমধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে গ্রামটির বহু দরিদ্র পরিবার। অনেকেই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে। আবার নিজেদের বিকল্প জায়গা না থাকায় অনেকে নিরুপায় হয়ে খালের পাড়েই পুনরায় ঘর বেঁধে কোনোমতে দিনাতিপাত করছেন। চলমান বর্ষায় খালের তীব্র স্রোতে ভাঙন আরও অব্যাহত থাকায় খালের পাড়ে ঝুঁকিতে থাকা শত শত পরিবারে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

খালের পাড়ের বাসিন্দা খায়েজ আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিলক খালের তীব্র ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে ইতিপূর্বে আমরা অনেকের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। সবাই শুধু আশ্বাসই দিয়েছেন, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রতি বছরই আমাদের জমিজমা খালে চলে যাচ্ছে।”

এদিকে নদী ভাঙন কবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক লায়ন শওকত আলী নূর। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাপ্তাই পওর (পোল্ডার ও ওয়ার্কস) উপ-বিভাগে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ সামছুল আরেফিন বলেন, “আমরা দ্রুতই এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করব এবং ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”