মোবাইল ফোনেই শিশুর শৈশব বন্দি

সাদিয়া আফরিন—

শিশু মানে নিষ্পাপ। শিশু মানে আদর।শিশু মানে ভালোবাসা। শিশু মানে আপন আলয় আনন্দে ভরপুর থাকা। তাদের আধোআধো কথায় সারাক্ষণ মন- প্রাণ চঞ্চল থাকে। তাদের দুষ্টুমিতে সবাই যেন থাকে প্রাণবন্ত । এ স্রষ্টার এক অনন্য উপহার । যেন স্রষ্টার রহমতে গড়া এক পবিত্র সৃষ্টি। কিন্তু বর্তমানে স্মার্ট ফোনের বদৌলতে শিশুদের এই স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে যেন ছন্দপতন ঘটছে। এখন শিশুরা নিজে হাসার চেয়ে ফোনে থাকা বিভিন্ন পুতুলের হাসি দেখতে ব্যস্ত। দুষ্টুমির পরিবর্তে শান্ত হয়ে এখন মুঠোফোনের টিকটিক দেখতে অভস্ত। সারাঘর আধোআধো কথায় মাতিয়ে না রেখে ডিভাইসের নয়েজপূর্ণ কথায় বেশ মশগুল তারা। এখন শিশুরা বই নিয়ে পড়ার চেয়ে মোবাইলের ই বুক পড়তে বেশি আনন্দ পায়। ঘরে- বাইরে খেলার চেয়ে স্ক্রিন স্ক্রলে মজা পায় বেশি।

একসময় শিশুদের গল্পে গল্পে খাওয়নো হতো। মন দিয়ে শুনতোও তারা। কত গল্প যে মা বাবাদের বানিয়ে বানিয়ে বলতে হতো তার তালিকাও অনেক লম্বা। কিন্তু এখন তা একেবারেই রূপকথার গল্প।
মায়েরা এখন আর গল্প শোনাতে অভ্যস্ত না। মা রা এখন ঝামেলা এড়াতে বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে । কিন্তু এতে মার সাময়িক কাজ কমে গেলেও শিশুকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে ।
কারন, মোবাইল বহন করে ক্ষতিকর আলো ও বিকিরিত রশ্মী যা শিশু সহ প্রাপ্তবয়স্কদের ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি ঘটায়। মোবাইল থেকে বের হয় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি নামক এক ধরনের তরঙ্গ যা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ করে। দীর্ঘসময় ব্যবহারের ফলে শিশুদের নাজুক ত্বকের কোমলতা নষ্ট হতে পারে। স্নায়ুকোষের যথাযথ কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। মোবাইল স্ক্রিন থেকে বের হয় নীল আলো। এই আলো শিশুদের চোখের কর্ণিয়া ও রেটিনা ধীরেধীরে নষ্ট করে ফেলে। এছাড়াও মোবাইলোর দিকে ঝঁুকে দেখার ফলে গাড়ে ব্যথা,চোখে ক্লান্তি এবং মনে অবসাদ আসে।
টানা স্ক্রিন স্ক্রল করার কারনে শিশুদের পেনসিল হাতে ধরার অভ্যাস নষ্ট হচ্ছে। মোবাইল নির্ভর হওয়ায় পরিবার ও আশেপাশের মানুষদের সাথে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে । ফলস্বরূপ,শিশুদের ভাষাবিকাশ দেরিতে হচ্ছে,বাকপ্রকাশ অস্পষ্ট হচ্ছে। আশেপাশের মানুষদের সাথে মেলামেশা না থাকায় দিনদিন অসামাজিক হয় উঠছে।
বিভিন্ন কার্টুন, টিকটিক এবং গেম দেখার ফলে মেজাজ খিটখিট হচ্ছে, অকারনেই জেদ করছে,খাবারে অরুচি প্রকাশ করছে,মাঠে খেলার আগ্রহ হারিয়ে শরীর স্থূলকার ধারণ করছে। শিশুবয়স থেকেই শারীরিকভাবে দূর্বল হয়ে বেড়ে উঠছে। ফলশ্রুতিতে, হারাচ্ছে মানসিক প্রফূল্লতা ও পড়ালেখার আগ্রহ।
তবে আমরা একটু কৌশলী আর সচেতন হলেই আমাদের বাচ্চারা ফিরে পাবে হারানো শৈশব।আমাদের যা করণীয়,
মা – বাবারা সময় ভাগ করে বাচ্চার সাথে খেলনা নিয়ে খেলা করা।বই পড়া,গল্প করা,ছবি আঁকা এবং মাঠে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া।
বাচ্চার বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন ছোটখাটো জিনিস নিয়ে আলাপচারিতা করা।
বাচ্চাকে মোবাইলের অপকারিতা সম্পর্কে বুঝানো। মোবাইল খেলার জিনিস নয়। এটা শুধু প্রয়োজনে ব্যবহারের জিনিস মাত্র যেভাবে বাসায় অন্যান্য জিনিস ব্যবহৃত হয়।
অবশ্যই বাচ্চার সামনে প্রয়োজন ব্যতীত মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।
যেসব মা – বাবা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা অনলাইন ব্যবসায়ী তাঁরা অবশ্যই বাচ্চাকে এসব কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা।
বাসায় মা – বাবা ছাড়াও অন্যান্য সদস্যদের মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা।
মা- বাবার সাথে নির্দিষ্ট সময় ও দূরত্ব মেনে টেলিভিশন দেখতে দেওয়া।
এই স্ক্রিন নির্ভর যুগে এসব নিয়ম মানা কষ্টসাধ্য মনে হতে পারে। তবে বাচ্চার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলে অসম্ভব কোনকিছুই নয়। কারন,প্রত্যেকটি বাচ্চা তাঁর মা – বাবার কাছে পরম “”আরাধ্য সত্তা “”। তাদের সুস্বাস্থ্য -ই আমাদের জীবনকে পরিপূর্ণ করে, আলোকিত করে। লেখক : শিক্ষক ও কবি