মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই (রাঙামাটি): প্রচন্ড তাপদাহ, কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিক ভাবে কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস, লোডশেডিংয়ের যন্ত্রনা ও টানা তিন মাসের জন্য মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা। সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় পার করছে রাঙামাটি জেলা সহ কাপ্তাই উপজেলা। প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক- এই তিনদিক থেকেই প্রভাব পড়ায় স্থানীয় জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যটননির্ভর এই জনপদে এখন পর্যটক নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো রাঙামাটি জেলায়ও মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে। দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকায় রাতেও স্বস্তি মিলছে না। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও সরবরাহে দেখা দিয়েছে বড় ঘাটতি। এর প্রধান কারণ কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত কমে যাওয়া। পানির অভাবে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন অস্বাভাবিক ভাবে কমে গেছে। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে একটি ইউনিট চালু রয়েছে। এতে ২৩০ মেগাওয়াটের স্থলে একটি ইউনিটে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ফলে রাঙামাটি জেলা সহ তার আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে গেছে। দিনে-রাতে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলায় জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পানির স্তর কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নৌপরিবহনেও। কাপ্তাই হ্রদ নির্ভর বহু খাল ও উপখাল প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে ছোট নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে, কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া চিন্তা করছেন যাতে পানিপ্রবাহ কিছুটা সচল রাখা যায়।
এদিকে, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন রক্ষা ও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২৫ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে হ্রদে তিন মাসের জন্য মাছ শিকার, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পরিবেশগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও জেলে পরিবার গুলো সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পর্যটনখাতে। মনোরম প্রকৃতি, লেকভিত্তিক ভ্রমণ ও নৌবিহারের জন্য পরিচিত কাপ্তাইয়ে এখন পর্যটক উপস্থিতি নেই বললেই চলে। অতিরিক্ত গরম, লেকের পানি কমে যাওয়া, নৌচলাচলে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎ সংকট—সব মিলিয়ে ভ্রমণকারীদের আগ্রহ কমে গেছে। হোটেল-রিসোর্ট, নৌভাড়া, স্থানীয় দোকানপাট—সবখাতের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, “গরমে থাকা যায় না, বিদ্যুৎ থাকে না, লেকে পানি নেই, এমতাবস্থায় পর্যটক আসবে কীভাবে?” পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির জন্য তারা প্রকৃতির উপর ভরসা করে আছে। ভারী বৃষ্টিপাত হলেই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে তারা জানায়।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হলে পানির স্তর স্বাভাবিক হবে না, আর পানির স্তর স্বাভাবিক না হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে কাপ্তাই এখন এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখে -প্রকৃতি, বিদ্যুৎ, জীবিকা ও পর্যটন—চারটি খাত একসঙ্গে চাপের মধ্যে পড়েছে। মৌসুমী ভারূ বর্ষন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই স্থবিরতা কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন তারা।












