জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৯৫

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে নানামুখী উদ্যোগ, সংস্কার ও পরিবর্তন আসার পরও সহিংসতার দিক বিবেচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন, বিচার বহির্ভূত হত্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

একইসঙ্গে শ্রমিক নির্যাতন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সভা সমাবেশে বাধা প্রদান, রাজনৈতিক মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তার এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশের দায়িত্ব পালনে ভীতি ও অনীহা ছিলো, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টির হয়েছে বলে মনে করছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ১৫টি জাতীয় পত্রিকা/সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারাদেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক ১৪১১টি সহিংসতায় ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। তারমধ্যে বিএনপির ১৩৪ জন, আওয়ামী লীগের ২৬ জন, জামায়াতের ৫ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থি দলের ৩ জন ও রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১৯ জন এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ২১৬টি ঘটনায় ৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন।

এছাড়া ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ত্যাগের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ৩৪৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৯ হাজার ৭৭২ জনের নাম উল্লেখ করে ৬৫ হাজারের অধিক ব্যক্তিতে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন মামলায় ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫৫ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এছাড়া, পুলিশ গত এক বছরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের অন্তত ৫১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৪১৩টি মব সহিংসতা ও গণপিটুণির ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে হত্যা-নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৮৩৪ জন সাংবাদিক। এর মধ্যে ৬ জনকে হত্যা, ৩৭৯ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৯১ জন লাঞ্ছিত, ১০৩ জনকে হুমকি এবং ৩৩ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়াও ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর অধীনে ৪১টি মামলায় ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৬৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা সারাদেশে ৫৫টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে বাধা প্রদান, ১৪৪ ধারা জারি, সংঘর্ষ, সভাসমাবেশ থেকে আটকসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫৪৮ জন আহত এবং ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংষর্ষ ইত্যাদি ঘটনায় ৬০ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৬ জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ২২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ও অসুস্থ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কারাগারে বা কারা হেফাজতে কমপক্ষে অসুস্থ, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ১২৭ জন আসামি (৪৪ জন কয়েদি ও ৮৩ জন হাজতি) মারা গেছে।

এ সময়ে অন্তত ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ১ হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন যার মধ্যে ৫৫০ (৫৪ শতাংশ) জন ১৮ বছরের কম বয়সী/শিশু। এছাড়া ২৩০ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন নারী । ৫০৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৭০ জন।

এছাড়া যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৪৪ জন (আত্মহত্যা-৪) ও আহত ৩৭ জন। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৫৪৪ জন (আত্মহত্যা ২৬৩ জন) নিহত ও আহত ১৭৬ জন। এসিড সহিংসতায় শিকার হয়ে নিহত ২জন এবং আহত ২ জন।

অন্যদিকে, শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৮০২ জন, যাদের মধ্যে ৪৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৩২৪ জন শিশু বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সীমান্তে হতাহত, আটক ও অবৈধভাবে পুশইন এর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৪৩ জন নিহত, আহত ৪৯ জন এবং ১৮৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এমনকি দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৩ হাজার ৫০৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইন ও ভারতীয় জলসীমার কাছে বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় কোস্টগার্ড ।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মি কর্তৃক সংগঠিত ২৬টি হামলার ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত, ১০ জন গুলিবিদ্ধ ও ২৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছেন। সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ২১টি ট্রলারসহ কমপক্ষে ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৫৬টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত, ২৭ জন আহত, ১৭ টি মন্দির, ৬৩টি প্রতিমা ও ৬৫টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং ৬টি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সারাদেশে শতাধিক মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৭ মাসে কমপক্ষে ৫৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬৪ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ৪৪৮ জন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ২৫৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ৫ জন গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সবস্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।