সাইক্লিস্ট রাকিবুলের মানবিকতা, কাপ্তাইয়ের অসহায় একটি পরিবারের জীবন বদলে গেল

মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই (রাঙামাটি): “দিনে আনি দিনে খাই, বৃষ্টি নামলে সারা রাত জেগে বসে থাকি, মাটির মেঝেতে পানি জমে বিছানা ভিজে যায়। খুুঁটি নড়বড়ে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ভয়ে সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরি।”— কাপ্তাইয়ের ওয়াগ্গা ইউনিয়নের কাঠালতলী এলাকার চন্দ্রলাল তনচংগ্যা ও ফুলবী তনচংগ্যা দম্পতির কণ্ঠে ছিল করুন উচ্চারণ ও বেঁচে থাকার দীর্ঘশ্বাস। দুই সন্তান নিয়ে ভাঙাচুরা আর পচন ধরা ঘরে বর্ষার রাতগুলো ছিল তাদের জন্য এক বিভীষিকাময়। তবে সেই দুশ্চিন্তার রাত ফুরিয়েছে মানবিকতার ছোঁয়ায়। আজ তারা পেলেন মাথা গোঁজার একটি মজবুত ঠিকানা। এই পরিবারের জীবনে আলোর দিশারী হয়ে এসেছেন জাতীয় সাইক্লিস্ট ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব রাকিবুল ইসলাম।

গত চার বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাইক্লিং প্রশিক্ষণের সুবাদে পাহাড় ও স্থানীয় মানুষের সাথে গড়ে উঠেছে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক। রাকিবুল ইসলাম জানান, “পাহাড়ের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা ও স্নেহ দিয়েছে, তার প্রতিদান স্বরূপ আমার পক্ষ থেকে এটি সামান্য উপহার।” তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং দেশ-বিদেশে থাকা শুভাকাঙ্ক্ষীদের পাঠানো অর্থে প্রায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে এই ঘর।
উল্লেখ্য, রাকিবুল ইসলাম এর আগে খাগড়াছড়িতে আর তিনটি অসহায় পরিবারকে গৃহনির্মাণে সহায়তা করেছেন।

এই মহতী উদ্যোগকে সফল করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা বীর কুমার তনচংগ্যা। তার নিরলস প্রচেষ্টায় এবং কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় পরিবারটি আজ নিরাপদ আশ্রয় পেল।ঘরটি হস্তান্তরের সময় আবেগাপ্লুত বীর কুমার তনচংগ্যা বলেন, “সমাজের মানুষের বিপদে মানুষই যদি পাশে না দাঁড়ায়, তবে পৃথিবীটা অনেক বেশি রূঢ় হয়ে যেত। আজ এই পরিবারটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে দেখে যে শান্তি পাচ্ছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”

নতুন ঘর হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন, ওয়াগ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবিমল তনচংগ্যা, ওয়াগ্গা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আশীষ কুমার তনচংগ্যা, শ্যামল তনচংগ্যা, সাফছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা উজ্জ্বলা রাণী তনচংগ্যা। ​এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের সভাপতি সুগত তনচংগ্যা, সাধারণ সম্পাদক টিপু তনচংগ্যা, সহ-কোষাধ্যক্ষ সোহেল তনচংগ্যা, সদস্য অপু তনচংগ্যা, লেডি বাইকার ও স্কুটি প্রশিক্ষক জেমিয়া ফারজানা নিতু। এছাড়া বাংলাদেশ তনচংগ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম (কাপ্তাই অঞ্চল), কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম কর্মী এবং স্থানীয় যুব সমাজের নেতৃবৃন্দ এই মহতী কাজের সাক্ষী হন।

নতুন ঘরে আশ্রয় পাওয়ার পর চন্দ্রলাল-ফুলবী দম্পতির চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। তারা বলেন, “আমরা ভাবতেও পারিনি আমাদের জীবনে এমন একটি দিন আসবে। আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় ছিলাম, এখন এই ঘরটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।”মানুষের জন্য মানুষের এই ভালোবাসা ও সহযোগিতার নজির এলাকা জুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন রাকিবুল ইসলাম ও তার অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবকরা।