বাজেটে ইভি ও হাইব্রিডে বড় কর ছাড়, কোন গাড়ির দাম কমতে পারে, কোনগুলো বাড়বে?

    মির্জা ইমতিয়াজ শাওন::

    পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি), প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (পিএইচইভি) এবং চার্জিং অবকাঠামো আমদানিতে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নির্দিষ্ট শ্রেণির পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি আমদানিতে করভার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের গাড়ির বাজারে নতুন এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

    আগামী বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবের খসড়া ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

    ইভি আমদানিতে বড় কর ছাড়

    বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে মোট করভার প্রায় ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই করভার কমে ৬৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে মোট করহার ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

    এছাড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সব ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি বহাল রাখার প্রস্তাব এসেছে। অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও ভ্যাট ছাড়া বাকি সব শুল্ক-কর অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে।

    প্লাগ-ইন হাইব্রিডেও বড় সুবিধা

    নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (পিএইচইভি) আমদানিতেও বড় ধরনের কর-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।

    প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন পিএইচইভি গাড়ির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং সম্পূরক শুল্ক কমানো হবে। ফলে এসব গাড়ির মোট করভার বর্তমান ৯৩ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৪৩ শতাংশে নেমে আসবে।

    অন্যদিকে ২ হাজার সিসি পর্যন্ত পিএইচইভি গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।

    চার্জিং স্টেশনে শূন্য শতাংশ কর

    দেশব্যাপী ইভি চার্জিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যে মোট করভার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ হলেও প্রস্তাব কার্যকর হলে তা শূন্য শতাংশে নেমে আসবে।

    পেট্রোল-ডিজেলচালিত গাড়িতে কর বাড়ছে

    অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ কমাতে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন (আইসি) ইঞ্জিনচালিত গাড়ির ওপর করভার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

    বর্তমানে এসব গাড়িতে মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তা বেড়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে অন্যান্য শ্রেণির গাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করহার অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

    কোন গাড়ির দাম কমতে পারে?

    বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কর কাঠামোর সুবিধা সবচেয়ে বেশি পেতে পারে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি। বিশেষ করে জাপানি জনপ্রিয় মডেলগুলোর দামে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।

    Toyota Aqua
    বর্তমান বাজারদর: ২৫-৩০ লাখ টাকা
    সম্ভাব্য কমতে পারে: ১-৩ লাখ টাকা

    Toyota Prius
    বর্তমান বাজারদর: ৩০-৪০ লাখ টাকা
    সম্ভাব্য কমতে পারে: ১-৩ লাখ টাকা

    Toyota Raize
    বর্তমান বাজারদর: ৩৫-৪৫ লাখ টাকা
    সম্ভাব্য কমতে পারে: ১-২ লাখ টাকা

    Honda Vezel Hybrid
    বর্তমান বাজারদর: ৪০-৫০ লাখ টাকা
    সম্ভাব্য কমতে পারে: ২-৪ লাখ টাকা

    Toyota Corolla Cross Hybrid
    বর্তমান বাজারদর: ৫০-৬৫ লাখ টাকা
    সম্ভাব্য কমতে পারে: ২-৫ লাখ টাকা

    ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারেও স্বস্তির সম্ভাবনা

    কর ছাড়ের সুবিধায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কয়েকটি জনপ্রিয় ইলেকট্রিক গাড়ির দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

    BYD Atto 3
    MG4 EV
    Nissan Leaf

    এছাড়া স্থানীয়ভাবে সংযোজিত Proton X50, Chery Tiggo সিরিজ এবং ভবিষ্যতে ওয়ালটনসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের গাড়িও তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে আসার সুযোগ পেতে পারে।

    বিলাসবহুল গাড়িতে তেমন প্রভাব নেই

    বিশ্লেষকদের মতে, ১৮০০ থেকে ২০০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার বড় জাপানি এসইউভি ও বিলাসবহুল সেডানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাসের সম্ভাবনা কম। একইভাবে ২০০০ সিসির বেশি প্রিমিয়াম গাড়ির ক্ষেত্রেও বর্তমান কর কাঠামো বহাল থাকায় বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।

    তবে গাড়ির প্রকৃত দাম কতটা কমবে বা বাড়বে, তা নির্ভর করবে বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদন, ডলারের বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং আমদানিকারকদের নতুন মূল্যতালিকার ওপর।

    সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজেট কার্যকর হওয়ার পর জুলাই-আগস্ট মাসে নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশের মাধ্যমে দেশের গাড়ির বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে।