প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯: ছাত্র ও তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির দামপাড়াস্থ কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ : ছাত্র ও তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে ০৪ মে (সোমবার)|

সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম, যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগ| সকাল ৯.৩০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীবৃন্দ, প্রক্টরিয়াল বডি, বিভিন্ন সংস্থার তরুণ প্রতিনিধি, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা অংশগ্রহণ করেন|

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন| তিনি বলেন, আমরা যখন পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হই, তখন সাধারণত খাবারকেই দায়ি করা হয়| এটা কেন হয়, তা খুঁজে বের করার জন্যই ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’| এটা কেবল একটি আইন নয়, এটি সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার| তিনি এই সেমিনারকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, ফরমালিনযুক্ত ফলমূল, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ভেজাল তেল দিয়ে তৈরি খাবার, বাসি খাবার শরীরকে রোগগ্রস্ত করে, শরীর ধ্বংস করে| আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, শরীর ঠিক রাখার জন্য অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে হবে| তিনি খাবার-দাবারের ভেজাল প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা, জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন| তিনি ভেজালমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এই সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এই ধরনের সেমিনার তরুণদের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করবে এবং তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে|
সভাপতির বক্তব্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর এস. এম. নছরুল কদির আমাদের দেশে নিত্যদিনের খাবার-দাবার ও ফলমূলে যে-ভেজাল থাকে সে-সম্পর্কে ও তার ভয়াবহতা সম্বন্ধে আলোকপাত করেন| তিনি বলেন, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞান বিতরণের স্থান নয়, বরং সচেতন নাগরিক তৈরির ক্ষেত্র| আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে সমাজে শোষণ ও প্রতারণা অনেকাংশে কমে যাবে|

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাননীয় ট্রেজারার প্রফেসর ড. জাহেদ হোছাইন সিকদার এই সেমিনারকে তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হলে শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর করলে হবে না; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে| একজন সচেতন ভোক্তা কখনো প্রতারণার শিকার হয় না, বরং অন্যদেরও সচেতন করে তোলে|

কীনোট স্পিকার ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ রাজীব চৌধুরী ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ : আইনের কাঠামো, সমস্যা, অধিকতর কার্যকারিতায় সুপারিশ এবং তরুণ সমাজের অধিকার সচেতনতায় করণীয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন| ভোক্তা আইনের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগ তখনই কার্যকর হয় যখন জনগণ তা সম্পর্কে সচেতন থাকে| শিক্ষার্থীদের উচিত আইনের মৌলিক বিষয়গুলো জানা এবং প্রয়োজনে তা প্রয়োগে সহায়তা করা| তরুণদের মধ্যেই রয়েছে পরিবর্তনের শক্তি|

রিসোর্স পারসন ও চট্টগ্রাম জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার জনাব মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; উৎপাদক, বিক্রেতা এবং ভোক্তা—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব| খাদ্যে ভেজাল একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা, যার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে|

রিসোর্স পারসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-চট্টগ্রামের বিভাগীয় উপ-পরিচালক জনাব মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, এই আইনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভোক্তাদের প্রতারণা, ভেজাল এবং অসাধু ব্যবসায়িক আচরণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করা| কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মোকাবেলায় সচেতন নাগরিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ|

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের চেয়ারম্যান জনাব অনুপ কুমার বিশ্বাস| তিনি বলেন, বর্তমান ভোক্তা-নির্ভর সমাজে সচেতনতা ছাড়া অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়| শিক্ষার্থীরা যদি এখন থেকেই ভোক্তা অধিকার বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে| এই সেমিনার সেই সচেতনতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ|

শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন| তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ| কিন্তু আইন থাকলেই হবে না, এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে| তরুণ সমাজকে এগিয়ে এসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে এবং ভোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে|

মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন| ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক জনাব কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী ও যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি জনাব আবু হানিফ নোমান তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর প্রদান করেন|

সমাপনী বক্তব্যে ক্যাব চট্টগ্রামের সহ-সভাপতি জনাব এম নাসরুল হক বলেন, আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, তরুণ সমাজ ভোক্তা অধিকার বিষয়ে আগ্রহী এবং সচেতন হতে চায়| এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে আমাদের একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়ন আরও সুদৃঢ় হয়|

অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়|