চবির সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আব্দুল আজিজ খাঁন ও তাঁর সময়কালের ছাত্র আন্দোলন

প্রফেসর আব্দুল আজিজ খাঁন স্যারের কথা অনেক মনে পড়ে । যদিও আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু বিশেষ করে মনে পড়ে কারণ তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের উপাচার্য। ওই সময় আমরা সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী ও শিক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলাম সরকার ও প্রশাসন এর পক্ষ থেকে । স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর সরকারি চাপ ছিল যাতে করে সেখানে আন্দোলন না হতে পারে। অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই আমরা সারাদেশে ৮২ সাল থেকে সারাদেশে ছাত্র লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্র লীগ, ছাত্র লীগ (জাসদ), ছাত্র লীগ (বাসদ) ও আরও কিছু সংগঠন সমন্বয়ে “ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করছিলাম । এর পাশাপাশি তবু ক্যাম্পাসের তথা আপামর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে অনেকগুলো দাবি নিয়ে সেসময় আন্দোলন করেছিলাম এবং আদায়ও করেছিলাম । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম শহর থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে আমাদের যানবাহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচুর সমস্যা ছিল। ছাত্রাবাসে সিট না পাওয়ায় হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের শহর থেকে যাতায়াত করতে হতো ।ক্যাম্পাসে ৮২-৮৫ সময়ের দাবীর মধ্যে ছিলো চট্টগ্রাম শহর- বিশ্ববিদ্যালয় রুটে বাস কন্সেশন চালু করা, সকল ছাত্রাবাসগুলোর সম্প্রসারণ করে আরো সীট সংখ্যা বাড়ানো, শহীদ মুক্তিযাদ্ধা আব্দুর রব ও প্রীতিলতার নামে নতুন আরো দুটি হল নির্মাণ করা, মুক্তিযুদ্ধে স্বারক ভাস্কর্য নির্মাণ, আইন বিভাগসহ নতুন কয়েকটি বিভাগ চালু করা, ৮৩র ছাত্র আন্দোলনে শহীদ মোজাম্মেলের নামে নতুন হল নির্মাণ, ক্যাম্পাসের হেল্থ সেন্টারকে আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করা, লাইব্রেরীর সম্প্রসারণ ইত্যাদি । এই দাবিগুলা আদায় করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আজিজ স্যারের নেতৃত্বাধীন চবি কর্তৃপক্ষের সাথে আমাদের অবশ্যই অনেক সভা হয়েছে, তর্ক হয়েছে, আমরা অনেকবার ধর্মঘট করেছি, ডেডলক করেছি, তবে সব করেছি আপামর ছাত্র ছাত্রীদের সমর্থন নিয়ে ও তাদেরই ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ।এ প্রসংগে মনে পড়ছে ৮২র শেষে সাবসিডিয়ারী পরীক্ষা পেছনের আন্দোলনের একপর্যায়ে সাবসিডিয়ারী পরীক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে একাডেমিক কাউন্সিলকে ঘেরাও করে রাখে।এই দু:সহনীয় পরিস্হিতি মেনে নিতে না পেরে একপর্যায়ে গভীর রাতে প্রফেসর হায়াত সাহেবদের নেতৃত্বে কয়েকজন তরুণ শিক্ষক ঘেরাও থেকে ধাক্কাধাক্কি করে বের হয়ে গেলে অন্যরকম পরিস্হিতির সৃষ্টি হয়। অতি দ্রুত ক্যাম্পাসে এই মর্মে গুজব ছড়িয়ে যায় যে, ছাত্রীদের চুল ধরে টানা হেচড়া করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে ইত্যাদি ।এসব শুনে ক্যাম্পাস থেকে বিদ্যুৎগতিতে অগণিত ছাত্ররা বেরিয়ে প্রফেসর আনিসুজ্জামান, আলমগীর সিরাজুদ্দীন সহ কয়েকজন শিক্ষকের গাড়ীতে হামলা, কয়েকজনকে লান্চিত করা হয়, কিছু শিক্ষকদের গাড়ীর উপর হামলা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্লাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং সারাদিন চলে উত্তেজনা।ঐ দিন আমরা ছাত্রনেতারা অবশ্য উদ্যোগ নিয়ে পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। আমরা ঐদিন বিকেল থেকে শিক্ষকদের বাসায় বাসায় গিয়ে আপামর ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষে ক্ষমা চেয়ে নিই । সেই সময় শিক্ষকদের চোখে মুখে যে কষ্টের ভাব দেখেছিলাম তার কখনো ভুলতে পারিনা । অন্যদিকে সাবসিডিয়ারির ভাইবোনদেরও আমরা জানিয়ে দিয়েছিলাম যে সরাসরি যারা শিক্ষকদের উপর হামলার জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলে আমাদের করার কিছু থাকবে না । পরে তারা হয়তো মার্সি পিটিশন দিতে পারেন ।এভাবে ছাত্র-শিক্ষকদের সুসম্পর্ক আমরা আবারো সৃষ্টি করি। মনে আছে, সাতজন বহিস্কৃত হয়েছিলেন । ঐ সময়ে কিছু ছাত্ররা আমাদেরকে “চবি প্রশাসনের দালাল” বলে অপপ্রচার করলেও আমরাএতে কোন দমে যাইনি । যাই হোক দাবী আদায় করতে গিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রাপ্ত উপাচার্যসহ কিছু শিক্ষকদের সাথে বাক বিতন্ডা অবশ্যই হতো, কিন্তু আমরা তাঁদের উপর সম্মান ঠিক রেখেই কথা বলতাম । আমার আরো মনে পড়ে ফরেস্ট্রীর ছাত্রদের একটি দাবি আদায় করতে গিয়ে বিশেষ করে ৭ জন ছাত্রের ভবিষ্যত রক্ষার্থে ( নিয়ম অনুযায়ী ২ বিষয়ের উপর ফেল করলে ইনষ্টিটিউটের ছাত্রত্ব শেষ) তাদেরকে আমরণ অনশন ধর্মঘট করতে হচ্ছিলো এবং এক পর্যায়ে দ্বিতীয় দিন অনশনকারীদের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের মা-বোন- বন্ধুদের কান্নায় সম্পূর্ণ পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছিলো । এই পর্যায়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সবাই তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং ক্ষুব্ধ হয়ে একাংশ ঐ দিন সাইন্স ফ্যাকাল্টিতে চলাকালীন একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আক্রমণের চেষ্টা চালালে আমরা বাঁধা দিই ।এই আন্দোলনটা ফরেস্ট্রীর ছাত্ররা করেছিলেন আমার উপদেশে এবং আমি উদ্যোগ নিয়ে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে তাদের সমর্থনে নিয়ে আসি, এই কথা আজিজ স্যারও জানতেন। তাই তিনি পরিস্থিতির চরম পর্যায়ে অনশনের প্যান্ডেলে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কি করলে এই পরিস্থিতি শেষ হবে । আমি স্যারকে বললাম স্যার আধা ঘন্টার মধ্যে আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে আসেন , আপনি একাডেমিক কাউন্সিল বা সিন্ডিকেট থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসেন, দাবী মেনে নিন স্যার, আগেও বলেছি আপনারা, শুনেন নাই । সাতটা ছাত্রের জীবন বাঁচাতে দিন স্যার। আধা ঘন্টা পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে আমরা ছাত্র নেতাদের কেউ দায়ী থাকবো না । যাই হোক, তিনি সেভাবেই অতি দ্রুত সবার সাথে কথা বলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার আগেই দাবি মেনে নেওয়াতে অনেক ভালো কাজটি করেছিলেন, নিয়মটাও স্হায়ীভাবে পাল্টে গেলো । অনেকগুলো কথা বললাম, অনেক দাবি আদায়ের কথা বললাম, অনেক কিছু বাস্তবায়নের কথা বললাম । কিন্তু সবকিছুই সম্ভব হত না যদি আজিজ স্যার পজিটিভ না থাকতেন বা বাস্তবায়নের জন্য কাজ না করতেন । কোন এক সময় আমরা ওনার পদত্যাগও দাবী করেছিলাম, তারপরও আমাদের প্রতি তিনি বৈরী কোন মনোভাব দেখান নি । ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামে আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি কিন্তু এনেক দোয়া আর শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা চিঠি পাঠ।

লেখক: ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন