বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, তবে কি ডলফিনশূন্য হবে হালদা?

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, প্রিয় চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে উদ্বেগজনক হারে মারা যাচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক| স্থানীয় মৎসজীবী, গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীতে অবাধে চলাচলকারী বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের আঘাত, দখল ও দূষণের কারণেই এসব ডলফিনের মৃত্যু ঘটছে| তারা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে একসময় হালদা নদী ডলফিনশূন্য হয়ে পড়বে|
মঙ্গলবার রাউজানের সিপাহির ঘাট এলাকায় আবারও উদ্ধার করা হয়েছে একটি মৃত এধহমবং জরাবৎ উড়ষঢ়যরহ (শুশুক)| এটি হালদা নদীতে উদ্ধার হওয়া ৪৯তম মৃত ডলফিন| স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি ছিল একটি পরিণত স্ত্রী শুশুক| এর ˆদর্ঘ্য ২৩৯ সেন্টিমিটার (প্রায় ৭ ফুট ১০ ইঞ্চি) এবং আনুমানিক ওজন প্রায় ৯১ কেজি|
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, মৃত্যুর প্রায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পর মৃতদেহটি নদীতে ভেসে ওঠে| দেহে তীব্র পচন, দুর্গন্ধ এবং মুখ, পেট ও লেজে ব্যাপক ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে|
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়ার নির্দেশনায় পিএইচডি গবেষক শাহ মোহাম্মদ কায়সার ও আইডিএফের নুরুল হাকিমের সহযোগিতায় ডলফিনটির সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়| পরে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য দাঁত সংগ্রহ করে মৃতদেহটি মাটি চাপা দেওয়া হয়|
গাঙ্গেয় ডলফিনের ˆবজ্ঞানিক নাম চষধঃধহরংঃধ মধহমবঃরপধ| স্থানীয়ভাবে এটি হুতুম বা শুশুক নামে পরিচিত| আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (ওটঈঘ) এ প্রজাতিটিকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে| এছাড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ীও এটি সংরক্ষিত প্রাণী|
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হালদা নদীতে প্রায় ২০০টির মতো ডলফিন রয়েছে| এর মধ্যে গত কয়েক বছরে ৪৯টির মৃত্যু অত্যন্ত উদ্বেগজনক|
হালদা বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, “ডলফিনের মৃত্যুর প্রধান কারণ বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের প্রপেলারের আঘাত| গচ্ছাখালি খাল হয়ে ড্রেজারগুলো হালদায় প্রবেশ করে| ড্রেজারের আঘাতে আহত হয়ে পরে ডলফিনগুলো মৃত অবস্থায় ভেসে ওঠে|”
তিনি আরও বলেন, “গাঙ্গেয় ডলফিনের চোখ কার্যত অকার্যকর| তারা ইকো সাউন্ডের মাধ্যমে চলাফেরা ও খাদ্য সংগ্রহ করে| শরীর অত্যন্ত নরম হওয়ায় ড্রেজারের আঘাত সহ্য করতে পারে না|”
হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে ১৭টি খাল| দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান এই প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র দেশের কার্পজাতীয় মাছের রেণুর প্রধান উৎস| তবে দখল, দূষণ, চোরা শিকার ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে হালদার জীববৈচিত্র‍্য এখন মারাত্মক হুমকির মুখে|
বিশেষজ্ঞরা অবিল¤ে^ হালদা নদীতে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীটিকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা এবং ডলফিনের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন|