“প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংসের মাশুল দিচ্ছে চট্টগ্রাম”

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: এক সময় পাহাড়, খাল, বিল আর নদীবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নগরী ছিল ঈযধঃঃড়মৎধস| বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত বিস্তীর্ণ জলাভূমি, খাল বেয়ে দ্রুত নেমে যেত পানি| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রাকৃতিক জলাধারগুলো হারিয়ে গেছে দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়নের গ্রাসে| ফলে এখন মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়| প্রতি বর্ষায় জলজট ও জলাবদ্ধতার অভিশাপে দুর্ভোগ পোহাতে হয় লাখো নগরবাসীকে|
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন আর শুধুই মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাধার ধ্বংস এবং সমš^য়হীন উন্নয়নের বহুমাত্রিক ফল| নগরের প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ হারিয়েছে| যে শহরে একসময় অসংখ্য খাল-বিল ছিল, সেখানে এখন বেড়েছে কংক্রিটের বিস্তার, কমেছে উন্মুক্ত জলাশয়|
নদী ও জলাধার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা জলাভূমি থাকা প্রয়োজন| কিন্তু চট্টগ্রামে সেই পরিমাণ এখন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে| নগরের অক্সিজেন এলাকার বিশাল বিলসহ বহু জলাভূমি ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা| ফলে অতিবৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি করছে দীর্ঘস্থায়ী জলজট|
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪২ হাজার একর কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট হচ্ছে| ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭৫৭ একর জলাভূমি হারিয়ে গেছে| এতে শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে না, বরং বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে বহুগুণে|
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খাল খনন বা ড্রেন সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়| প্রয়োজন প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, নতুন জলাধার সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমšি^ত নগর পরিকল্পনা|
নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, “চট্টগ্রামের ৭২টি খাল উদ্ধার করে প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে| উন্মুক্ত জলাশয় যাতে ভরাট না হয়, সেদিকে সিডিএকে কঠোর নজরদারি করতে হবে| পাশাপাশি টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন, ব্রিজ-কালভার্ট প্রশস্তকরণ এবং পানি চলাচলের ¯^াভাবিক পথ নিশ্চিত করতে হবে|”
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, “নগর আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে| চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সেবা সংস্থাগুলোর সমš^য়, প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সচেতনতা|”
পরিবেশবিদরা বলছেন, দেশে জলাধার রক্ষায় একাধিক আইন থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ খুবই দুর্বল| জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী পুকুর, খাল, লেক ও জলাশয় ভরাট শাস্তিযোগ্য অপরাধ| একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরকেও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে ¯^ীকৃতি দেওয়া হয়েছে| কিন্তু বাস্তবে প্রভাবশালী মহলের দখল ও ভরাট থামানো যাচ্ছে না|
১৯৯৫ সালে সিডিএ প্রণীত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় নতুন খাল খনন, জলাধার নির্মাণ, সিল্ট ট্র‍্যাপ স্থাপন এবং কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালের মুখে জোয়ার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছিল| কিন্তু দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়েও অধিকাংশ সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি|
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে এখনই নদী-খাল-বিল ও জলাধার রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে| নতুন করে জলাধার ও লেক সৃষ্টি, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, খাল দখলমুক্ত করা এবং সমšি^ত নগর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না| নইলে প্রতিটি বর্ষাই নগরবাসীর জন্য আরও বড় দুর্ভোগ ও বিপদের বার্তা হয়ে ফিরে আসবে|