
প্রতিবছর ২৯ এপ্রিল এলেই দক্ষিণ উপকূলের মানুষের বুকের ভেতর অদৃশ্য এক কাঁপন জেগে ওঠে| হালকা বাতাসের শব্দও যেন হঠাৎ করে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক ভয়াল রাতের স্মৃতিতে|
প্রকৃতির রুদ্র রূপের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতা আজও ছড়িয়ে আছে উপকূলের বালুকাবেলায়, ভাঙা বেড়িবাঁধের ধারে, আর মানুষের হৃদয়ের গভীরে|
১৯৯১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে আমি অবস্থান করছিলাম কুতুবদিয়ায়| ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বড়ঘোপের রোমাইপাড়ায় গোলাম মাবুদ মাস্টার বাড়িতে থাকতাম| ২৬ এপ্রিল, শুক্রবার, মহেশখালী থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সেখানে পৌঁছাই| সেদিন রেডিওতে সমুদ্রের জন্য ২ ন¤^র সতর্ক সংকেত প্রচার হচ্ছিল| চারপাশে সবকিছু ¯ স্বাভাবিক—ওই পরিবারে ধান মাড়াই চলছে, গ্রামীণ জীবনের চিরচেনাছন্দ—তবুও কোথাও যেন এক অদৃশ্য অশনি সংকেত ঘুরপাক খাচ্ছিল| পরদিন আকাশ মেঘলা হয়ে ওঠে, সাগরও অস্থির উত্তাল | বড়ঘোপ বাজারের পাশের বেড়িবাঁধে ঢেউয়ের আছড়ে পড়া যেন এক নীরব সতর্কবার্তা দিচ্ছিল—বিপদ খুব দূরে নয়| ২৮ এপ্রিল রবিবার সকালে কলেজে গিয়ে শুনলাম ক্লাস বন্ধ| প্রকৃতি যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে|
২৯ এপ্রিল, সোমবার সকালে বাতাসের গতি বাড়তে থাকে| রেডিওতে ঘোষণা আসে—কক্সবাজার উপকূলে ১০ ন¤^র মহাবিপদ সংকেত| আমরা বুঝতে পারলাম, এবার আর সাধারণ ঝড় নয়| আমার জ্যাঠাতো ভাই আহমদুর রহমান—গ্রামের সবাই যাকে কালাইয়া বলে ডাকত—আর আমি বসে ভাবতে লাগলাম| সকালের খবরে শুনতে পাই গাঁ ও পদ্মা নদীর পানি খালি হয়ে গেছে অর্থাৎ বঙ্গ সাগর ঐ পানি নিয়ে ফুলে ফুঁসে উঠছে| জলোচ্ছ্বাস এলে বাঁচার উপায় কী? হঠাৎ মাথায় এলো এক অদ্ভুত চিন্তা| বাড়ির পূর্ব পাশে পুকুরপাড়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা চারটি তালগাছের উপর যদি একটি উঁচু মাচা ˆতরি করা যায়! আমি আর আহমদ রহমান সকাল দশটার দিকে বকব বাজারে যাই বলার জন্য কিছু মোটা দড়ি কিনার জন্য,দড়ি নিয়ে কেন আসতেছি ও এলাকার লোকজন জানতে চাইলো আমরা বললাম ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচাতে মাচা বাঁধার জন্য, একথা শুনে সবাই পাগল বললো, কুতুব দিয়া ও মহেশখালী দুপাগল মিলে পাগলামী করছে| রোমাই পাড়ার মানুষ আমাদের পরিকল্পনা শুনে হাসাহাসি করেছিল|
আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলাম বাতাসের গতিবেগ ২৩৫ কিলোমিটার হবে আর ঘূর্ণিঝড়টি ব্যাস হবে ৭৫ কিলোমিটার, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া বাঁশখালী মহেশখালী এই অঞ্চলটা হচ্ছে ঝড়ের প্রবেশ মুখ, উপকূল থেকে অবস্থান করছে| রাতনাগাদ এই উপকূল অঞ্চলে আঘাত হানবে|
আমরা মাচা ˆতরির কাজে লেগে গেলাম উপরে বাসা ˆতরি শুরু করছি, পুকুরের পূর্ব পাড়ে বাঁশ বাগান দক্ষিণ পূর্ব কোণে চারটি তালগাছ ৬/৭ হাতের ভিতরে| উপরে বাঁশগুলো একটু লম্বা করে কাটছি যদি বাতাসে গাছগুলো দুললে মাচা ছিড়ে পড়ে যেতে পারে সেভাবে বাঁশগুলো কেটে বড়শি গেট দিয়ে দোলনা আকারে গিট দিয়ে,আবার বেঁধে শক্ত করে বাঁধা হয়, ওই মাচার বিছানি ছিল ছোট পাইয়ে বাস দিয়ে| মাচার উত্তর পাশে সিড়ি শক্ত করে বাঁধা মাটির সাথে পুঁতেছি| তখন ভয় সাথে অদ্ভুত বুদ্ধিও হয়ে ওঠে জীবনরক্ষার হাতিয়ার| আমরা বাঁশ, দড়ি দিয়ে প্রায় বিশ হাত উঁচুতে একটি মাচা ˆতরি করলাম|
গোলাম মাবুদ মাস্টারের মা বয়োবৃদ্ধ চলাচল অক্ষম তাকেসহ বিকেলের দিকে পরিবারের অন্য সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আলী আকবর ডেইল একটি দুইতলা মাদ্রাসায় চলে গেল| যাবার আমার জেটি মা বললেন তোর কিছু হলে তোর বাপ মনছুরকে কী কবাব দিবো,আমি বললাম, মাচা বেঁধেছি না,পানি এলেই ওই মাচায় চলে যাবো, আহমদ রহমান দুজনই বাড়ীতে থেকে যাবার সিন্ধান্ত হলো| আহমদর রহমার তাদেরকে দিয়ে এসে রুনো আপার নিয়ে যাবে, এমন কথা হলো। তখন ঝড়োবাতাস বইছে| কিন্তু ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে ।আমি, রুনো আপা বাড়িতেই আহমদুর রহমানের অপেক্ষায় আছি | আমি আর রুনো আপা বই, অন্যান্য জিনিসগুলো ঘরের দমদমায় অথার্ৎ ছাদে তুলে রাখলাম এই ঘর মাটির ঘর ৬০ ইংরেজি তুফানের পরে এটা তৈরি হয়েছিল বড় বড় দেওয়াল দিয়ে| আমি লইট্টা মাছ অল্প করে ভাত খেলাম| নামাজ আদায় আদায় করে তওবা কররাম।ভাত তরকারি কাঠের চৌকিতে উপর রাখলাম, পানি এলে ঘরের ভিতরে চকি ভাসবে| পরে খেতে পারা যায় তুফানের পরে এই পরিকল্পনায় করি রুনো আপা ও আমি | রাত আটটার দিকে আহমদ রহমান ঝড়ে ভিজে অনেক কষ্ট করে এলেন| পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ছিল যে রুনুকে দিয়ে সে আর আসতে পারবে না সে আমার জন্য রয়ে গেল| গেলে আর ফিরতে পারবেনা এবং রয়ে গেলাম আমরা তিনজন|
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির ভয়াল রূপ বাড়তে লাগল| ঝড়ো বাতাস, প্রবল বৃষ্টি, আর অন্ধকার—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ|রাতে ১১টা দিকে কে যেন বাইরে থেকে ডাকছিল, আমরা ছিলাম মূল ঘরে ভিতরে, দরজা খুলে তাদের ছোট চাচা,একটা কাঁথা ডুকলো,তার ঘর উড়ে নিয়ে গেছে,
ঘরের পশ্চিমপাশের জানালা দিয়ে দেখছিলাম টচলাইটের আলোতে পানি আসছে কিনা কিন্তু প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে বাতাস হচ্ছে গাছপাড়া উপড়ে ফেলছে,পাশে রেড়িওতে আব্বাস উদ্দিনের গান চলছে,কিছুক্ষণ পর পর ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান জানাচ্ছিলেন ওই সময় তারা বলছিলেন কক্সবাজার উপকুল ও চট্টগ্রামে অতিক্রম করছে | আহাম্মদ রহমান তার হাতে থাকা টর্চ লাইট দিয়ে জানালা দিয়ে দেখতে ছিলেন পানি আসছে কিনা রাত সাড়ে বারোটার দিকে আচমকা চিৎকার—“পানি এসে গেছে!” মুহূর্তের মধ্যে উঠোন ভরে গেল পানিতে, আর সেই পানি ক্রমেই বুকসমান হয়ে উঠল| আমরা হাত ধরে বাইরে বের হতেই তীব্র স্রোত আমাদের ছিন্নভিন্ন করে দিল| আমি স্রোতে ভেসে গিয়ে একটি তালগাছে আঁকড়ে ধরি| মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তখন মনে হয়েছিল—এটাই হয়তো শেষ মুহূর্ত| আল্লাহর কাছের তওবা করলাম এবং হায়াত চাইলাম, খুব কান্না করে আল্লাহর কাছে মিনতি করলাম হায়াতের জন্য| এরপর অদৃশ্য এক শক্তি যেন আবার বাঁচার ইচ্ছা জাগিয়ে তুলল|
আমার পাশেও ধরেছিল আরেক তার গাছ ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন সাথে আহমদ রহমানের ছোট চাচা, তিনি বলেন, ৬০ ইংরেজীর তুফান দেখেছি, এরকম পানি বাতাস আর দেখেনি, বাবা তুমি জোয়ান ছেলে চেষ্টা করো মাচায় যেতে, অবশেষে সাঁতরে পুকুর উত্তর পাড়ে উঠি,ওই ওই পাড়ে সারি সারি আম গাছ,ওগুলোর সাপোর্ট নিয়ে পূর্ব পাড়ে গেলাম, ওখানে ছিল বাশঝাড়, সব বাঁশ নুয়ে মাটিতে পড়ে গেছে, আর অল্পদুরে মাচার সিড়ি,অনেক কষ্টে মাচায় উঠতে সক্ষম হই| সেখানে রুনো আপা আর আহমদরহমানকে দেখতে পেয়ে মনে হলো—মৃত্যুর অন্ধকারে একটুকরো আলো ফিরে পেয়েছি|
চারটি তালগাছের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট মাচায় আমরা তিনজন সারারাত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছি| উত্তাল ঢেউ মাঝে মাঝে মাচার উপর এসে আছড়ে পড়ছিল| চারদিকে শুধু পানি, হালকা আলো যেন হারিকেনের আলো, দেখছি ভেসে যাওয়া মানুষের আর্তনাদ| মনে হচ্ছে আমরা তিনজন পাছাটা নিয়ে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে আছি|
আমরা দোয়া ইউনুস পড়ছিলাম বারবার| প্রতিটি ঢেউ মনে হচ্ছিল শেষ আঘাত| রাত তিনটার পর বাতাসের তীব্রতা কমতে শুরু করে| ভোরের দিকে পানি নামতে থাকলে আমরা নিচে নামি| চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাশ, ভাঙা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়া গাছ—একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত জনপদ| আহমদ রহমানের ঘরটি বসে গেছে কিছু ছাল উড়ায়ে নিয়ে গেছে।
পরদিন আমার খোজে আমার আব্বা আমার চাচতো ভাই জনি, ফুফাতো ভাই হুমায়ুণকে আমার খোজে মহেশখালী থেকে কুতুিদিয়ায় পাঠালেন।তারা সাগর উত্তাল ছিল তাদের অনেক কষ্টে আসতে হয়েছে।আসার সময়কিছু আপদ কালিন শুকণো খাবার অন্যন্যা প্রযোজনীয় জিনিস পাতি।
সৌভাগ্যক্রমে আশ্রয় নেওয়া পরিবারের সদস্যরা বেঁচে ফিরেছিলেন| কিন্তু আশেপাশের অনেকেই আর ফিরে আসেনি| আমার এক কলেজবন্ধুও তার বাবাসহ প্রাণ হারায়| সেই শোক আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে| পরবর্তী দুই সপ্তাহ আমরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘরবাড়ি পুনর্গঠনের কাজে লেগে ছিলাম| কিন্তু মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে—যদি দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হতো, তবে হয়তো আরও অনেক প্রাণ রক্ষা পেত| আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—সেই তালগাছের মাচা শুধু একটি আশ্রয়স্থল ছিল না| ওটা ছিল মানুষের অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, সাহস আর আশা|
লেখক: সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক












