মৌসুম ভিত্তিক কয়েক কোটি টাকা বিকিকিনি, অযত্নে জন্মানো পাহাড়ী ফুলঝাড়ু বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে

মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই(রাঙামাটি): অযত্নে, অবহেলায় জন্মানো অপ্রধান বনজ সম্পদ পাহাড়ী ফুল ঝাড়ুর কদর দিনদিন বাড়ছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে এই ফুলঝাড়ু এখন বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। শুধু কাপ্তাই থেকে প্রতি মৌসুমে ৭০-৮০ লাখ টাকার ফুলঝাড়ু বিক্রি হয়ে থাকে। সমগ্র পার্বত্য এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকার ফুলঝাড়ু কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। ফলে মৌসুম ভিত্তিক এই ফুল ঝাড়ুর ব্যবসা করে অনেকেই বেশ লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি মোটা অংকের রাজস্ব পাচ্ছে সরকার।

কাপ্তাই উপজেলায় ব্যবসার প্রানকেন্দ্র কাপ্তাই জেটিঘাট এলাকায় গত বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রায়ারী) দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের নৌ পথ দিয়ে দূর্গম বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চল থেকে বিশেষ করে কাপ্তাই ও বিলাইছড়ি উপজেলা থেকে আসছে বোঝায বোঝায় ফুল ঝাড়ু। নৌকা থেকে এসব ফুল ঝাড়ু গুলো সারি সারি করে উঠানো হচ্ছে ট্রাকে। পাহাড়ে উৎপাদিত এসব ফুল ঝাড়ুর কদর রয়েছে সারাদেশ জুড়ে। এসব ফুলের ঝাড়ু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে ঘাটের প্রায় ৩০-৩৫ জন শ্রমিক।

কাপ্তাই জেটিঘাট ফ্রিংখিয়ং বন শুল্ক ফাঁড়ির দায়িত্বে নিয়োজিত ষ্টেশন কর্মকর্তা মোঃ ওমর ফারুক স্বাধীন জানায়, একসময় পাহাড়ি অপ্রধান এই বনজ সম্পদ ফুল ঝাড়ু শুল্কমুক্ত ছিল। বর্তমানে প্রতি আঁটি ফুল ঝাড়ু ৭০ পয়সা হারে শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এঅঞ্চল থেকে দেশের যেকোন প্রান্তে নিতে হলে এই শুল্ক অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে ব্যবসায়ীদের।
আলাপকালে স্থানীয় শ্রমিক আবুল হোসেন ও বদি আলম জানায়, দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে একাজের সাথে তারা জড়িত। প্রতিবছরই এই মৌসুমে ফুলের ঝাড়ু পরিবহনের কাজ করে থাকে তারা। দৈনিক ৬শ’ টাকা মজুরিতে পাইকারী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তারা ফুলের ঝাড়ু ট্রাকে উঠানোর কাজ করে ৩০-৩৫ জন শ্রমিক। প্রতিদিনই নৌ পথে ফুলঝাড়ু জেটিঘাটে আসলেও সপ্তাহের শনিবার সাপ্তাহিক হাটের দিন বেশী ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের। এদিন ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত ঝাড়ু সরবারহ কাজে ব্যস্ত সময় পার করে থাকে তারা।

ফুল ঝাড়ু বিক্রি করতে কাপ্তাই জেটিঘাটে আসা কাপ্তাইয়ের হরিনছড়ার বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা, সুনিল তনচংগ্যা, বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের পুষ্প তনচংগ্যা সহ বেশ কয়েকজন বিক্রেতা জানান, পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই ফুল ঝাড়ু ১০ থেকে ১৫টি দিয়ে আঁটি বেঁধে ঝাড়ু বানানো হয়। প্রতিটি ঝাড়ুর আঁটি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। বেশ কয়েকবছর ধরে তারা এই ফুল ঝাড়ু বিক্রয় করে লাখ লাখ টাকা আয় করে আসছে।

চট্টগ্রাম শহরের বিবির হাট থেকে আসা আনোয়ার হোসেন নামের ক্রেতা জানান, পাহাড়ের ফুল ঝাড়ুর কদরের কথা শুনে তিনিও বেশ কয়েক বছর ধরে কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে ঝাড়ু ক্রয় করছেন। প্রতি ট্রাকে প্রায় ৩ হাজার বান্ডেল ফুল ঝাড়ু পরিবহন করা যায়। এছাড়া প্রতি বান্ডেল দেড় থেকে ২ হাজার টাকায় ক্রয় করে থাকেন। পাশাপাশি সেগুলো শহরে নিয়ে খুচরা বাজারে বিক্রয় করে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা আয় হয় তার। তিনি আরও বলেন, এই ফুল ঝাড়ুর কদর দিনদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানী করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলিতে এই ফুল ঝাড়ুর বেশ চাহিদা রয়েছে। প্রতি হাটবারে প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকার ফুলঝাড়ু বিকিকিনি হয়ে থাকে। তারা আরও বলেন, তিন পার্বত্য এলাকা থেকে মৌসুম ভেদে মধ্যস্বত্ব ভোগিরা কয়েক কোটি টাকার ফুলঝাড়ু কিনে নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। পরে এসব ঝাড়ু তারা চড়াদামে বিক্রি করে থাকে।

কাপ্তাই জেটিঘাটের ট্রাক চালক আবদুর রহিম, মোঃ শামসু মিয়া, মোঃ আলী জানান, কাপ্তাইয়ের সাথে সরাসরি শহরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় অনেকটা কম পরিশ্রম ও স্বল্প মূল্যে এসব ফুল ঝাড়ু গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি কাপ্তাই সড়কে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভাল হওয়ার ফলে অনেক ঝামেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু বেশ কয়েকজন চালক জানান, জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বর্তমানে পরিবহন ব্যয় অনেকটা বেড়ে গেছে। ফলে বর্তমানে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।