আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়ায় মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-এর প্রিয় জন্মস্থান। তাহার পিতার নাম শাহ মাওলানা আবদুল মোনাফ (রহ.)। তিনি ছিলেন পীরে কামেল হযরত শাহ মাওলানা সুফি ছদরুদ্দিন (রহ.)-এর খলীফা। পাকিস্থান শাসন আমলে সকলে এলাকায় মাওলানা সাহেব নামে সম্বোধন করতেন, শাহ মাওলানার তিন সন্তান এবং তিন কন্যার মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)- ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী, শৈশবকাল থেকে চাল চলন, কথা বার্তায়, আচার আচরন, ধর্মীয় ও দ্বীনি শিক্ষার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ, ধীরে ধীরে আল্লাহর একাত্ববাদ ও আনুগত্য প্রকাশ এবং নবীপ্রেমে ভালোবাসা মাওলানার চরিত্রে ফুটে ওঠেছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা দারুল উলুম হতে সফলতার সাথে কামিল ডিগ্রি পাশ করে নিজেকে নিয়োজিত করেন বিভিন্ন সামাজিক এবং দীনি কাজে। তিলে তিলে গড়ে তোলেন এক বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার বোয়ালখালী উপজেলার প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন ও ওস্তাদুল ওলামা হযরত শাহ মাওলানা আবদুল হক (রহ.)-এর কাছে একনিষ্ট ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে কোরান হাদিসের আলোকে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে তালিম নিতেন এবং এক সময় এই বুড়া মাওলানা নামে খ্যাত এর খুবই আপনজন হয়ে পড়েন হযরত বুড়া মাওলানার ইন্তেকালের পর বোয়ালখালীতে একমাত্র মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-তাঁর শূন্যতা পূরণ করেন এবং পথহারা মানুষদের দীনের দাওয়াত, আল্লাহর একাত্ববাদ এবং আশেকে রসুলের কাতারে সামিলের পরামর্শ দিয়ে যান।

মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-নিজেকে স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ না রেখে বোয়ালখালীসহ চট্টগ্রামের বড় বড় আলেমেদ্বীন, পীর মোশায়েক ও বুজর্গনদের সাথে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশাসহ ওয়াজ মাহাফীলেও গুরুত্বপূর্ণ তকরির করে দীনের খেতমত এবং রাসুলপাক (সা.)-এর জীবনলোচনা ও দাওয়াত জনগনের মধ্যে পৌছায় দিতেন। এক সময় তিনি বোয়ালখালীতে প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন এবং শিক্ষানুরাগীতে পরিণত হন। হযরতে গারাঙ্গীয়া এবং খলীফায়ে গারাঙ্গীয়া, চুনতীর শাহ সাহেব (রহ.), মাওলানা আতিকুল্লাহ শাহ (রহ.), শাহ মাওলানা আবদুল বারী (রহ.), ইমামে আহলে সুন্নাত, বায়তুল শরীফের পীর সাহেব, পটিয়ার শাহ মাওলানা মুছা মোজাদেদ্দী (রহ.)-সহ চট্টগ্রামের বাঘা বাঘা আলেমেদীনদের সাথে ছিল তাহার একান্ত ঘনিষ্টতা। এক সময় তিনি গারাঙ্গীয়ার বড় হুজুরের কাছে বায়াতও হন। বোয়ালখালীতে বেশীরভাগ বড় বড় নামাজে জানাজায় ইমামতিতে মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-এর আগমন পরিলক্ষিত হতো এলাকার মানুষ তার উপস্থিতি কামনা করতো। ইসলামিক ফরায়েজ সম্পর্কিত জটিল সমস্যার সিদ্ধান্তে এবং সমাধানে হযরত মাওলানার বিকল্প কেউ ছিল না বোয়ালখালীসহ দক্ষিন চট্টগ্রামে। সর্ব সাধারণের মাঝে আলেম সমাজের মর্যাদা সমুন্নত করতে তিনি আজীবন চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

মাওলানা আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধন কর্মে প্রচুর মোশাহিদা করেন। তিনি মোরাকাবা মোশাহিদায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন তাহাজ্জুত সহ-ফজরের নামাজের পর মোরাকাবা করতেন এছাড়াও তিনি নিয়মিত কোরান এবং হাদিসের চর্চা করতেন তার আপন নিবাসে একটি লাইব্রেরী ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসাময় আকুলতায় তারা হয়েছেন সৃষ্টির দিশারী, পথহারাদের পাঞ্জেরী, তাদের নূরানী কর্নকুহরে যেন প্রতিনিয়ত ধ্বনিত ত হয় নিপীড়িতদের আহাজারি, বঞ্চিতদের রোনাজারি একজন মানুষকে যে সুমাহান উদ্দেশ্য নিয়ে খোদা তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টিরুপে দুনিয়াতে পাঠায় মানুষ যখন তা ভুলে যায় তখন খোদার প্রতিনিধি হয়ে নবী (সা.)-এর আদর্শকে বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে সলফে সালেহীনগন তথ্যযুগের যাঁরা সংস্কারক থাকেন তাঁরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন, সে সমস্ত পথভোলা মানুষকে খোদার পথে এনে জান্নাতের সুঘ্রাণ দেয়ার যার হৃদয়ে নবীর প্রেম থাকে, যারা আশেকে রসুল (সা.)-এ পরিণত হয় তার জীবনতো সুন্নাতের অলংকারে সুসজ্জিত থাকবে তার চলাফেরায়, চিন্তা ধারায়, কথা বার্তায় ইসলামের জ্যোতি, সুন্নাতের প্রীতি, খোদার ভীতি হবে দৃশ্যমান, ইনসানিয়াত হবে বেগমান। সর্বোপরি খুঁজে পাবে এহসান তথা খোদার সন্ধান, মারেফতের সুঘ্রাণ, জান্নাতের মেশক আম্বর সুঘ্রাণ মাওলানা তীক্ষ্ন বুদ্ধি ও প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব মানুষকে সম্মোহিত করে রাখত।
মাওলানা দীর্ঘ ৩০ বৎসরের অধিক সময় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলতার সাথে শিক্ষকতা করে প্রতি ঘরে ঘরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন এবং বেশকয়েকবার শ্রেষ্ট প্রধান শিক্ষকের সম্মামনা পান উপজেলা পর্যায়ে পাশাপাশি দীর্ঘ ৫০ বৎসরের অধিক সময় ধরে মসজিদের খতিবের দায়িত্ব এবং দীনি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান করে এলাকাকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত করে বহু ছাত্র এবং আলেম সমাজ রেখে যান। নিজেকে বিভিন্ন দীনি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন যখনই সময় পেতেন আল্লাহর ইবাদত, রিয়াজ এবং আধ্যাত্বিকতায় নিজেকে মশগুল রাখতেন অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করেননি সারাজীবন হক কথা বলেছেন ইসলাম বিদ্বেশী এবং আল্লাহর একাত্ববাদ এবং নবীর প্রেমে যারা বাধা সাজতেন তাদের বিরুদ্ধে খুবই সোচ্চার এবং প্রতিবাদী ছিলেন বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরার পীর কামেল হযরত শাহ মাওলানা মীর রশীদ আহমেদ (রহ.)-এর ২য় কন্যার সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আল্লাহর একাত্ববাদ, আনুগত্য এবং আশেকে রসুলের কাতারে নিজেকে শামিল চেষ্টা করেছেন। সব দিক দিয়ে সৎ, ধার্মিক, আল্লাহওয়ালা একজন গ্রহণযোগ্য সম্মানি ব্যক্তি হিসেবে তার ছিল বোয়ালখালীতে যথেষ্ট সুনাম মাওলানা ছিলেন রাসুলে করিম (সা.)-এর পূর্ণ অনুসারী অত্যান্ত স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে সবার সাথে তিনি মিশে যেতেন তার বুদ্ধিদীপ্ত আকর্ষন ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ, উন্নত জীবনাদর্শ, সেবামূলক মনোভাব, জ্ঞানপিপাসু মন, ভক্তদের প্রতি মমত্ব, নৈতিক আদর্শ, মানসিক সুস্থতা, ধৈর্য্য, দৃঢ়চেতা মনোভাব, সমাজ সচেতনতা, ব্যক্তিগত অধিকার ও মর্যাদায় বিশ্বাস, নির্ভীকতা, দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতি সম্প্রীতি ও সদ্ভাব সারা জীবন অক্ষুন্ন ছিল। তাঁর খোদাভীরুতা, রসুল-প্রেম, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন বলয়ে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক সফলতা মুক্তির দিশা হিসেবে ভুমিকা পালন করতো তাঁর উপস্থিতি যে কোন মজলিশ বা অনুষ্ঠাণকে উদ্ভাসিত ও আলোচিত করতো।

মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-১৯ ডিসেম্বর ২০১৪, ৫ পৌষ ১৪২১, ২৫ সফর ১৪৩৬ হিজরী রোজ শুক্রবার সকাল ০৮ ঘটিকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৩ বৎসর বয়সে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এই দুনিয়া হতে পর্দা করেন ঐ দিনই আছরের নামাজের পর মাওলানার বড় ছেলে শাহাজাদা মাওলানা তাজুল ইসলাম নোমানী এর ইমামতিতে এবং তৎকালীন সময়ে হাজার হাজার মানুষের সমাগমে মাওলানার নামাজে জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হয় তার দাফন কর্ম পরিচালনা এবং আখেরী মোনাজাত করেন পীরে কামেল শাহ মাওলানা নুর মোহাম্মদ মুজাদেদ্দী (রহ.)-মাওলানার রুহের মাগফেরাত কামনায় এলাকার হাজার হাজার জনতা মোনাজাতে শরীক হোন পিতা শাহ মাওলানা আবদুল মোনাফ (রহ.)-ও মাতা বেগম ছাহেবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

শেষ কথা : আসুন, বর্তমানের ফিতনার এই সময়ে আমরা সকলেই মাওলানা মুহাম্মদ সেকান্দার শাহ (রহ.)-সহ হককানী এবং দ্বীনদার আলেমদের ছায়াতলে এসে নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজে নেই। মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ তিনি যেন আমাদের সকলকে মাওলানার ফয়েজ দ্বারা ধন্য করেন। দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করার তাওফিক দান করেন আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক : ফখরুল ইসলাম নোমানী, ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট