মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, প্রিয় চট্টগ্রাম : বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম| দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে| জাতীয় রাজ¯^ আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে চট্টগ্রাম কাস্টমস, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও রপ্তানিমুখী খাত থেকে| অথচ দীর্ঘদিন ধরে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ অভিধাটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে| প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের অভাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীটি তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি|
২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন| সেই ঘোষণার দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে বাণিজ্যিক রাজধানীর কাঠামোগত ভিত্তি গড়ে ওঠেনি| ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা এই নগরী এখনও তার প্রাপ্য গুরুত্ব ও সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত|
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা যেন শুধু সাইনবোর্ড বা সরকারি নথিতে সীমাবদ্ধ না থাকে; এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে| তাই এবারের জাতীয় বাজেট চট্টগ্রামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কারণ এই বাজেটই নির্ধারণ করতে পারে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গতিপথ|
গত ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ নগরের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছিলেন, বিএনপি সরকার চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে| সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায় চট্টগ্রামবাসী| এজন্য প্রয়োজন বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ|
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ দিতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বে-টার্মিনাল নির্মাণ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সমšি^ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষা, আধুনিক রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ অপরিহার্য| পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা চট্টগ্রামে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে|
চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, ইপিজেড, কেইপিজেড, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, ইস্টার্ন রিফাইনারি, কর্ণফুলী টানেল ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমšি^ত অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে| এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম শুধু দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারে|
ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ঢাকাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে| তাই শিল্পায়ন, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, পানি, নগর অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতের জন্য এবারের বাজেটে পৃথক ও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি|
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত এবারের বাজেট হবে এই অঞ্চলের উন্নয়নের নতুন মাইলফলক| দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামকে শক্তিশালী করা মানে জাতীয় অর্থনীতির ভিতকে আরও সুদৃঢ় করা| তাই এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার| বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা এই বাজেটেই নিশ্চিত করতে হবে|
চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন| দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও গতিশীল করতে হলে চট্টগ্রামকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দিতে হবে| আর সেই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে এবারের জাতীয় বাজেট|
বাড়ি আমাদের চট্টগ্রাম চট্টগ্রামের উন্নয়নেই অর্থনীতির গতি: বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বপ্নপূরণে বাজেটে বিশেষ প্যাকেজ জরুরি












