শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: সততা, দেশপ্রেম ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অমলিন প্রতীক

অধ্যাপক মির্জা মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ:: আজ ৩০ মে। স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাষ্ট্রনায়ক এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি সেই মহান নেতাকে, যিনি শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করেননি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তিও নির্মাণ করেছিলেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি অনন্য নাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি জাতিকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্ব, বিশেষ করে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য অবদান, তাকে জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।

স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল স্বাধীনতা অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি আত্মমর্যাদাশীল, উৎপাদনমুখী ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন। সেই লক্ষ্যেই তিনি প্রবর্তন করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। তার ভাষায়, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে ধারণ করেই আমরা বাংলাদেশি। এই দর্শন দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রয়াস ছিল।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সততা, কর্মনিষ্ঠা ও সাদামাটা জীবনযাপন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে কখনো ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেননি। তার সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে—তিনি উপহার গ্রহণে অনাগ্রহী ছিলেন, ব্যক্তিগত ব্যয়ে অত্যন্ত সংযমী ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও একই আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন।

তার মৃত্যুর পর পাওয়া ব্যক্তিগত সামগ্রীর তালিকা একজন রাষ্ট্রপতির নয়, বরং একজন সৎ ও নিরহংকার মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি বহন করে। একটি পুরোনো সুটকেস, কয়েকটি সাধারণ পোশাক, একটি কলম, জায়নামাজ ও কিছু ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী—এগুলোই ছিল তার সম্পদের পরিচয়। ক্ষমতা ও প্রভাবের শীর্ষে থেকেও এমন নির্মোহ জীবনযাপন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন উন্নয়নমুখী ও দূরদর্শী। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, যুব উন্নয়ন, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মতো বহু কর্মসূচি তার শাসনামলে গুরুত্ব পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব তখনই, যখন গ্রামের মানুষ উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হবে।

বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাও তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে একটি কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। তার ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি ও কর্মসূচি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হওয়া উচিত। তাই তিনি নিয়মিত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সফর করতেন, মানুষের কথা শুনতেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করলেও তার আদর্শ, চিন্তাধারা ও কর্মপ্রেরণা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। সময়ের প্রবাহে অনেক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু দেশপ্রেম, সততা, আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রগঠনের যে দৃষ্টান্ত শহীদ জিয়াউর রহমান স্থাপন করে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আজ তার শাহাদাতবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই মহান রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি স্বাধীনতার চেতনা, জাতীয় মর্যাদা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বীর উত্তম, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

তার আদর্শ আমাদের প্রেরণা, তার কর্মগাথা আমাদের ইতিহাস, আর তার দেশপ্রেম আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে চিরকাল।
লেখক: অধ্যাপক মির্জা মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন