এখনকার সময়ে চলচ্চিত্রে নারীদের যেমন পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, আগে তেমন ছিল না। সে সময় পুরুষদের নারী সাজিয়ে পর্দায় আনা হত। আর এই ট্যাবুকেই ভেঙ্গেছিলেন রওশন জামিল। নারী-পুরুষের এই ভেদাভেদ ভেঙ্গে তিনি নিজেকে মেলে ধরেছিলেন আপন আলোয়। তিনি ঢাকার রোকনপুরে ১৯৩১ সালের ৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই নাচ–গান ভালোবাসতেন। ঘর থেকেই শুরু করেছিলেন চর্চা।
‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় তার রাগী চরিত্র সবার মনে যেমন ধরে ছিল, তেমন এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই জহির রায়হান তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের একনায়কতন্ত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন। খল অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে স্বাতন্ত্র্য করেছিলেন, তবে বিভিন্ন চরিত্রেও নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছিলেন কতটা দক্ষ অভিনেত্রী তিনি।

‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে তিনি খান আতার সঙ্গে জুটি বেঁধে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার ঠিক কয়েক বছর পরেই সুজন সখিতে খান আতার মায়ের চরিত্রে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন। সুজন সখি শুধু নায়ক-নায়িকার ছবি নয়, এর বাইরে যে দুইটি চরিত্র বেশ গুরুত্ব পেয়েছে তা হল খান আতা ও রওশন জামিলের চরিত্র। সুজন সখির দাদীর চরিত্রে যে মায়াভরা অভিনয় করেছিলেন তা অতুলনীয়।
বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। এই সিনেমায় শফির মা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় ওনার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, এ ছাড়া ‘দহন’, ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’, ‘পেনশন’, ‘টাকা আনা পাই’ এই সিনেমাগুলোতে যেমন মমতাময়ী মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তেমন চিরাচরিত বাণিজ্যিক ধারার ছবি ‘আমার সংসার’-এও খল চরিত্রে দর্শকদের আরেকবার চমক দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোছনা’য়ও তিনি অভিনয় করেন নানির চরিত্রে। ‘মিস লোলিতা’ ছবিতে মেথরানী চরিত্রে মুগ্ধ করেছিলেন। সিনেমার পাশাপাশি অনেক নাটকেই অভিনয় করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে ‘কূল নাই কিনার নাই‘, ‘সকাল-সন্ধ্যা‘, ‘ঢাকায় থাকি‘, ‘তালা‘ অন্যতম।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বহুমাত্রিক অভিনয় করেও জুরি বোর্ড সেভাবে সুবিচার করেননি তাকে। বেঁচে থাকাকালীন একটি মাত্র জাতীয় পুরস্কারই দেখে যেতে পেরেছিলেন, মৃত্যুর পর ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ সিনেমার জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ সিনেমাতে বিধবা পিসির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যিনি দেশভাগের করুণ যন্ত্রণার শিকার হয়ে মাতৃভূমি ছেড়েছিলেন। অভিনেত্রীর বাইরে তিনি নৃত্যশিল্পী ছিলেন। স্বামী বিখ্যাত নৃত্য পরিচালক গওহর জামিল। দুজনই নৃত্য সংগঠক ছিলেন। নৃত্যে অবদানের জন্যই ১৯৯৫ সালে একুশে পদক পেয়েছিলেন তিনি। ১৯৩১ সালের আজকের এই দিনেই তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২০০২ সালের ১৪ মে তিনি পরলোকে পাড়ি জমান।












