“শহর ডুবছে শুধু বৃষ্টিতে নয়,আমাদের অবহেলায়ও”

সাজিদ হাসান: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি নাগরিক আচরণ, শহর ব্যবস্থাপনা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধেরও প্রশ্ন। আমরা যদি নিজেদের পরিবর্তন না করি, তাহলে বারবার একই দুর্ভোগের কথা বলে যাব, কিন্তু সমাধানের পথে এগোতে পারব না। জলাবদ্ধতা নিয়ে যখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের ঝড় ওঠে, তখন দোষ চাপানো হয় সিটি কর্পোরেশন, মেয়র কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। কিন্তু সত্যি কথা হলো, শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; নাগরিকদেরও সেখানে বড় ভূমিকা আছে।
প্লাস্টিকের বোতল, ফোম, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, ছোট দুধের প্যাকেট, প্লাস্টিক কাপ-থালা, বেবি ডায়পার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, গৃহস্থালি আবর্জনা, এমনকি স্কুল ব্যাগ পর্যন্ত যখন নালায় গিয়ে জমে, তখন জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই নাগরিক সচেতনতা ছাড়া শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে এই সংকট পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়।
তবে এটাও সত্য যে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সরকারের হাতে নেওয়া কাজগুলো পুরোপুরি শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। সামনে বৈশাখের মৌসুমি বৃষ্টি ও বর্ষা আসছে। এই সময়টি মাথায় রেখে চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি, মেয়র, সিডিএ চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের এখনই বসে একটি আগাম পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে নাগরিক ভোগান্তি কমানো যায়। বিশেষ করে জামাল খান, প্রবর্তক, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদসহ যেখানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ চলছে, সেখানে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যানজট থেকে মানুষকে রেহাই দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাননীয় মেয়র মহোদয়ের কাছে আমার বিনীত আবেদন।
– প্রত্যেক ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা টিমকে আরও শক্তিশালী করা হোক।
– আবাসিক এলাকার সমিতিগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনে উৎসাহিত করা হোক।
– “অ্যাডপ্ট এ রোড” কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিক, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে নির্দিষ্ট রাস্তা বা ওয়াকওয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে পথ পরিষ্কার থাকবে, তদারকি বাড়বে, আর অযথা টং দোকান, ভ্যানগাড়ি বা এলোমেলো দখল করে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারবে না। প্রয়োজনে কমিউনিটি পুলিশ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যুক্ত করা যেতে পারে।
– প্রত্যেক ওয়ার্ডে ময়লা দ্রুত অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরিকল্পিত দোকান, টং দোকান ও ভ্যানগাড়ির আশপাশের বর্জ্য যেন ড্রেনেজে না ফেলা হয়, সে বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা ও প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাখা দরকার।

– একই সঙ্গে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোকে CSR কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সিটি কর্পোরেশন তাদের পুরস্কৃত করতে পারে।
নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌরকর প্রদানকারী নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করাও একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে।
– প্রত্যেক ওয়ার্ডের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে “সিটি নাগরিক সেল” গঠন করা যেতে পারে, যারা মাসিক মিটিংয়ের মাধ্যমে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
– চট্টগ্রামকে ক্লিন, গ্রীন ও হেলদি সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ৪১টি ওয়ার্ডকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কোন ওয়ার্ড কী ধরনের মানদণ্ড পূরণ করলে “হেলদি ওয়ার্ড” হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার।
– চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে পরিবেশ দূষণ রোধ, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং 3R—Reduce, Reuse, Recycle-নীতি অনুসরণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত কার্যক্রম অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব।

– উন্নয়ন, বাজেট ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও কাউন্সিলর ও এলাকার বিশিষ্ট নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।

আমার কাছে ব্যক্তি বড় নয়; আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়িত্বের জায়গা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারে যিনি বসে আছেন, তিনি সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি কোন দল করেন, তা আমার কাছে মুখ্য নয়। আমার কাছে তিনি নগরপিতা—এবং তার কাছ থেকে আমি নাগরিক সেবাই দেখতে চাই। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, সব দোষ তাঁর একার নয়। নগরের প্রতি আমাদেরও দায়িত্ব আছে। নাগরিক সহযোগিতা ছাড়া সুন্দর নগর, পরিচ্ছন্ন নগর ও বাসযোগ্য নগর গড়া সম্ভব নয়।
আজ অনেক কিছুই বললাম, কিন্তু সবই আমার একান্ত ভাবনা, চেতনা ও ভালোবাসা থেকে। চট্টগ্রামকে আমি ভালোবাসি। তাই চাই, এ নগর হোক পরিচ্ছন্ন, সবুজ, সুশৃঙ্খল ও মানুষের জন্য আরও বাসযোগ্য। সুযোগ পেলে কোনো গোলটেবিল বৈঠকে আমার প্রিয় চট্টগ্রাম নিয়ে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনাও তুলে ধরতে চাই। ভালো থাকুক আমার প্রিয় চট্টগ্রাম,ভালো থাকুক চট্টলবাসী।