ফতিমা ফালগুনী, প্রিয় চট্টগ্রাম: “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়”—বিদায়ের সুরে যেন মিলিয়ে যায় পুরোনো বছর, আর নতুনের আলোয় জেগে ওঠে সময়ের প্রান্তর। এমনই আবহে চট্টগ্রাম নগরের সিআরবি শিরীষতলা মুখর হয়ে ওঠে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবে।
‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে’—অশোক ও পলাশের রূপে মুগ্ধ হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চরণে যেমন প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তেমনি বসন্তের শেষ প্রহরে প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে। শিমুল-পলাশের রাশি রাশি রঙে বাংলা নববর্ষের আগমনী বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের—“ভাঙো ভাঙো ভাঙো কারা, জাগো জাগো জাগো সারা”—এই আহ্বান যেন নতুনের আগমনে পুরোনোকে ভাঙার প্রতীকী উচ্চারণ হয়ে বর্ষবিদায়ের আবহকে আরও গভীর করে তোলে।
বাংলা নববর্ষ ও ঋতুরাজ বসন্তের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বসন্ত এলেই চারপাশ ফুলে-ফুলে ভরে ওঠে, আর বৈশাখের শুরুতে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম নগরের সিআরবি শিরীষতলার শতবর্ষী বৃক্ষরাজির ছায়ায় বসন্তের শেষ বিকেলে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মিলনে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আবহ। পাতার ঝিরঝিরে শব্দ, দখিনা মৃদু বাতাস এবং নূপুরের রিনঝিন সুরে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
নতুন বছরের আগমনে প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। পাখির কূজন, কোকিলের ডাক, শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি এবং গাছে গাছে কচি সবুজ পাতার সমারোহ—সব মিলিয়ে পুরোনোকে বিদায় ও নতুনকে বরণের এক অপূর্ব আহ্বান সৃষ্টি করে।
রবিবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে সিআরবি শিরীষতলায় নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন।
এ আয়োজনে অংশ নেয় প্রায় ৩০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন। নাচ, গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে শিল্পীরা তুলে ধরেন বিদায়ী সময়ের স্মৃতি ও নতুনের আহ্বান। অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল—অনন্যা সঙ্গীত নিকেতন, বেঙ্গল মিউজিক একাডেমী, লালন পরিষদ, আনন্দ ধারা সাংস্কৃতিক একাডেমী, নৃত্য তরঙ্গ একাডেমী, নূপুর শিঞ্জন একাডেমী, মাধুরী নৃত্যকলা একাডেমী, স্পন্দন কালচারাল একাডেমী, টিম সমর্পণসহ আরও অনেক সংগঠন।
সার্বিকভাবে নাচে-গানে ও আবৃত্তিতে মুখর এই আয়োজনে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
এছাড়াও প্রতিবছরের ন্যায় এবারো ‘চুহুর খান দিঘি বৈশাখী মেলা ও বলীখেলা’ হয়েছে বছরের শেষ দিনে।
বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে হাটহাজারীর কুয়াইশ কলেজ মাঠে প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা ও বলীখেলা। স্থানীয়ভাবে এটি ‘চুহুর খান দিঘি বৈশাখী মেলা ও বলীখেলা’ নামে পরিচিত।
এবারের বলীখেলায় উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে টেকনাফের রবিউলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন কুমিল্লার রাশেদ বলি।
ঐতিহ্যবাহী এই বলীখেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার মিলনে আয়োজিত এ মেলা যেন চট্টগ্রামের লোকজ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আয়োজকরা জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই আয়োজন শুধু বিনোদনই নয়, বরং বাঙালির লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।












