মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, প্রিয় চট্টগ্রাম : মুসলিম উম্মাহর কাছে জমজম শুধু একটি কূপের নাম নয়, বরং এটি আল্লাহর অসীম রহমত, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য নিদর্শন| প্রায় চার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহমান এই পবিত্র পানির উৎস আজও কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে|
পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামের ভেতরে, কাবা শরিফের পূর্বদিকে প্রায় ২০ মিটার দূরে অবস্থিত জমজম কূপ| হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্য জমজমের পানি পান করা এক অনন্য আত্মিক অনুভূতি| প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখো মুসল্লি এই পবিত্র পানি পান করেন এবং প্রিয়জনদের জন্য সঙ্গে করে নিয়ে যান|
ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশু পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে নির্জন মরুভূমিতে রেখে যান| পানি ও খাদ্যের সংকটে পড়লে হাজেরা (আ.) সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার ছুটে বেড়ান| ঠিক তখনই আল্লাহর রহমতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের কাছে ফেটে বেরিয়ে আসে পানির ধারা| সেই অলৌকিক জলধারাই আজকের জমজম কূপ|
ইতিহাসবিদদের মতে, এই পানির উৎসকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পবিত্র নগরী মক্কা| বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ মানুষের এই নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমজমের ঐতিহ্য|
প্রায় ৩১ মিটার গভীর এই কূপ থেকে সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার লিটার পানি উত্তোলন করা হয়| হজ ও রমজান মৌসুমে এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১৬ লাখ লিটারে পৌঁছে যায়| আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পানির স্তর, তাপমাত্রা ও গুণগত মান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়|
গবেষণায় দেখা গেছে, জমজমের পানি ¯^চ্ছ, গন্ধহীন এবং এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ফ্লুরাইডসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান| প্রতি লিটার জমজমের পানিতে প্রায় ৮৩৫ মিলিগ্রাম খনিজ উপাদান রয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের সাধারণ নলকূপের পানিতে রয়েছে প্রায় ৩৫০ মিলিগ্রাম খনিজ|
কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জমজমের পানিতে কোনো ক্ষতিকারক জীবাণু বা ˆশবালের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি| এর পিএইচ মাত্রা ৭.৯ থেকে ৮.০ হওয়ায় এটি সামান্য ক্ষারধর্মী| হাদিসে জমজমের পানিকে বরকতময় ও উপকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে| রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা পূরণে সহায়ক হয়|” তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে এই পানি শুধু তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং বরকত, আশা ও আল্লাহর অনুগ্রহের এক জীবন্ত নিদর্শন|
আজও পবিত্র কাবাঘরের সন্নিকটে অবস্থিত এই কূপ অবিরাম প্রবাহিত হয়ে চলেছে, বহন করে চলেছে হাজার বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস ও মানবতার এক অনন্য স্মৃতি| মুসলিম বিশ্বের কাছে জমজম তাই শুধু একটি পানির উৎস নয়, বরং এটি আল্লাহর অসীম রহমত ও বরকতের এক চিরন্তন প্রতীক|












