নতুন বাজেটে সবুজ অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেটে গ্রিন বাজেটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আজ রোববার (৭ জুন)। বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া এ অধিবেশনে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আগামী জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটের এ সম্প্রসারণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সবুজ অর্থনীতি (Green Economy) এবং গ্রিন বাজেটিং।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও জলবায়ু ঝুঁকির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, বনভূমি হ্রাস এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। ফলে নতুন বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নির্মাণের রূপরেখা হওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও তাপপ্রবাহে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। অথচ পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে বরাদ্দ এখনো জাতীয় অর্থনীতির তুলনায় সীমিত। ফলে নতুন বাজেটে পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অধিক বিনিয়োগের দাবি জোরালো হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে গ্রিন বাজেটিং ও গ্রিন ট্যাক্সেশন পদ্ধতি অনুসরণ করছে। ফ্রান্স সরকারি ব্যয়কে পরিবেশগত প্রভাব অনুযায়ী মূল্যায়ন করে, সুইডেন কার্বন ট্যাক্সের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়েছে, আয়ারল্যান্ড জলবায়ু ব্যয়ের হিসাব পৃথকভাবে অনুসরণ করছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সাল থেকে কার্বননিবিড় পণ্যের ওপর বিশেষ কার্বন কর আরোপের পথে এগোচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশকেও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নের মানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন উন্নয়ন প্রয়োজন যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, শিল্পায়নকে এগিয়ে নেবে, আবার নদী, বন, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্যকেও রক্ষা করবে। কারণ পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ শুধু অবকাঠামো নয়; নদী, বন, কৃষিজমি, জলাশয় ও জীববৈচিত্র্যও জাতীয় সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শিল্পায়ন, টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সম্পদের সুরক্ষা এবং ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার। বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বের সর্বাধিক পরিবেশবান্ধব কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে অন্যান্য শিল্পখাতেও সম্প্রসারণ করা গেলে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।

নতুন বাজেটে ‘গ্রিন বাজেট ট্যাগিং’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে কোন সরকারি ব্যয় পরিবেশের জন্য ইতিবাচক, কোনটি নিরপেক্ষ এবং কোনটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর—তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে দূষণকারী শিল্প ও পণ্যের ওপর ধাপে ধাপে পরিবেশ কর বা ইকো-ট্যাক্স আরোপ করে সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় হাওর উন্নয়ন বোর্ডের আদলে একটি উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণও সময়ের দাবি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সবুজ অর্থনীতি কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। তাই নতুন বাজেট হোক এমন একটি বাজেট, যা উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন যাত্রায় এখন সময় এসেছে—একটি সত্যিকারের ‘সবুজ বাজেট’ প্রণয়নের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত করার।