বাজেটে সাহসী সিদ্ধান্ত নিন, সৌরশক্তিতে বিপ্লবের এখনই সময়

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে শিল্পায়ন, নগরায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়লা, এলএনজি ও উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ আমদানির বোঝা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সৌরশক্তিকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় জ্বালানি বিপ্লবের সূচনা করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজারে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে সৌরবিদ্যুৎ খাতে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে নতুন যুক্ত হওয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অধিকাংশই এসেছে সৌরশক্তি থেকে। চীন একাই গত বছর ৩০০ গিগাওয়াটের বেশি নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বহু গুণ বেশি।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। দেশের প্রতি বর্গমিটার ভূমিতে দৈনিক ৪ থেকে ৬.৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা সৌর বিকিরণ পড়ে, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অথচ এই বিপুল সম্ভাবনার সামান্য অংশই কাজে লাগানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খুবই সীমিত অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। অথচ স্রেডার রোডম্যাপে ২০৪১ সালের মধ্যে কয়েক দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং বাজেট সহায়তা ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দেশের সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করেই ১০ থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে বাধ্যতামূলক রুফটপ সোলার ব্যবস্থা চালু করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে লক্ষাধিক সেচপাম্প ডিজেল বা গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এসব পাম্প পর্যায়ক্রমে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে বছরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচও হ্রাস পাবে।
সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি নতুন কর্মসংস্থানেরও উৎস। সৌর প্যানেল উৎপাদন, ইনস্টলেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড ও নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য এটি হতে পারে একটি নতুন শিল্পখাত।

এবারের বাজেটে তাই কয়েকটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি
সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহার/ কমানো;
রুফটপ সোলার স্থাপনে নগদ প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ চালু;
নেট-মিটারিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও দ্রুত অনুমোদন;
সরকারি ভবন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলোতে বাধ্যতামূলক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন;
উপকূলীয় চরাঞ্চল, নদী ও জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন;
রেলওয়ে করিডোর ও মহাসড়কের দুই পাশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা;
নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পৃথক ও শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা।
বাংলাদেশের সামনে আজ দুটি পথ খোলা—একটি ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার, অন্যটি দেশীয় ও টেকসই সৌরশক্তিভিত্তিক ভবিষ্যতের। বিশ্বের অনেক দেশ দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশও পারে।
বাজেট কেবল অর্থ বরাদ্দের দলিল নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা। তাই এবারের বাজেটে সৌরশক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা শুধু বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করবে না; বরং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, পরিবেশ সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ নয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।