৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন, উপকৃত হবে ৭ কোটি মানুষ

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট, লবণাক্ততা, নদী ভরাট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বহুল আলোচিত বহুমুখী পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)| প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে|
একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি| তিনি বলেন, “এ প্রকল্পের সঙ্গে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল সম্পৃক্ত| ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে| জন¯^ার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একনেক আজ প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে| এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে|”
মন্ত্রী বলেন, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়| ফলে পদ্মা অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য নদী, খাল ও জলাশয় শুকিয়ে পড়ে| একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি,নদী নাব্যতা সংকট, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ˆতরি হয়েছে|
তিনি আরও বলেন, “সব দিক বিবেচনায় এটি একটি মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প| এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ ছিল| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী সমাবেশে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন|”
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে| শুরুতে এক ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও বিপুল অর্থায়ন, বাস্তবায়ন জটিলতা এবং নদীর পরিবর্তিত হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে|
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল ব্যারেজ নির্মাণ, হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেম পুনঃখনন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করা হবে| দ্বিতীয় পর্যায়ে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম পুনরুদ্ধারসহ অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে|
প্রকল্পের আওতায় পাংশা উপজেলা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে| ব্যারেজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক, দুটি ফিস পাস এবং ব্যারেজের ওপর একটি রেলওয়ে সেতু| পাশাপাশি গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীতে পৃথক অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে|
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে| এ সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেমে পুনরায় পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে|
এ ছাড়া প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন| মূল ব্যারেজ ও গড়াই অফটেকে দুটি হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে| এর মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ এলাকায় ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং গড়াই অফটেকে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে|
প্রকল্পের আওতায় গড়াই-মধুমতি নদীতে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা নদী সিস্টেমে ২৪৬ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ করা হবে| একই সঙ্গে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার এফ্ল্যাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে|
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে| সুন্দরবনে ¯^াদু পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে| একই সঙ্গে যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থারও উন্নয়ন হবে|
প্রকল্প এলাকার আওতায় চার বিভাগের ২৪টি জেলার ১৬৩টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে| প্রথম পর্যায়ে ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে| সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে| এতে ধান ও মাছ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে|
মাশফিকুস সালেহীন বলেন, “পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে| তবে এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নদীর ¯^াভাবিক গতিপ্রকৃতি, পরিবেশগত ভারসাম্য ও পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে|”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প নয়; বরং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ, নৌচলাচল ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা| ফারাক্কার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নদী ও জনপদের জন্য পদ্মা ব্যারেজ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা|