সুপেয় পানির অভাব, আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড় এলাকায়

মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই(রাঙামাটি): ​পাহাড়ের বুক চিরে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আবার পাহাড়ের আড়ালেই হারিয়ে যায়। কিন্তু কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অতি দুর্গম নারানগিরি সীতা পাহাড় এলাকার চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। এখানে শতাধিক মারমা পরিবারের শিশুদের ভাগ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর আগেই যেন আঁধার নেমে আসছে। কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্বে হলেও আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া থেকে আজও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এই জনপদ। এখানে নেই কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা, নেই সুপেয় পানির নূন্যতম নিশ্চয়তা।

শিশুদের দীর্ঘশ্বাস উঁচু-নিচু পাহাড় আর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এই এলাকা থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ‘পায়ে হাঁটা’। যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কোমলমতি শিশুদের পক্ষে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে শিক্ষা গ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব। বর্তমানে এই এলাকার শিশুরা ৫ কিলোমিটার দূরের ডলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে।

​৫ম শ্রেণির ছাত্র উক্যহ্লা মারমা আক্ষেপ করে বলে, “আমরা অনেক কষ্ট করে ৫ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে ডলুছড়ি স্কুলে যাই। দিন শেষে শরীর আর চলে না, খুব কষ্ট হয় আমাদের।” একই কষ্টের কথা জানায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী মায়ইনু মারমা। মায়ইনুর বাবা থোয়্যাজ্ঞ মারমা ও মা ক্রইনুংমা মারমা বলেন, “পেটের দায়ে আমরা দিনমজুরের কাজ করি। সন্তানদের এত দূরে স্কুলে পাঠিয়ে সারাদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। ঘরের কাছে স্কুল থাকলে আমাদের ছেলে মেয়েরা মানুষের মতো মানুষ হতে পারত।”

​এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে ‘সংগ্রাম’ নামক একটি এনজিও এই দুর্গম এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে স্কুলটি ছিল এই শিশুদের একমাত্র ভরসা। তখন জেলা পরিষদের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হতো। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ৫ বছর আগে স্কুলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ৬৫ জন ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

​তবে এই অন্ধকারের মাঝেও আশার প্রদীপ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় দুই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী অংসাচিং মারমা ও সাইনুচিং মারমা। কোনো বেতন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ছাড়াই জরাজীর্ণ বেড়ার ঘরটিতে তারা শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জানায়, “প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া আমাদের জনপদের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই কষ্ট হলেও আমরা হাল ছাড়িনি।”

এদিকে,জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার পাশাপাশি এই এলাকায় আরেক বড় সংকট সুপেয় পানি। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি ছড়াগুলি শুকিয়ে গেলে এলাকায় খাবার পানির হাহাকার পড়ে যায়। আবার বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা ময়লা ও ঘোলা পানি বাধ্য হয়ে পান করতে হয়। এতে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার শিশু সহ বৃদ্ধরা।

সীতা পাহাড় এলাকার কার্বারি পাইচিংমং মারমা ও স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ক্যথোয়াই অং মারমা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “আমাদের স্বপ্ন আজ ধ্বংসস্তূপে পরিনত হচ্ছে। দয়া করে একটি স্থায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে আমাদের শিশুদের বাঁচান।”
​এবিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, পাহাড়ি দুর্গম পথ হওয়ায় এলাকাটি পরিদর্শনে সমস্যা হলেও তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ডলুছড়ি স্কুল থেকে এই এলাকাটি অনেক দূরে এবং যাতায়াত খুবই কষ্টসাধ্য। আমি ইতিমধ্যে জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি।”

এলাকার সচেতন ব্যক্তিরা জানায়, পাহাড়ের এই দুর্গম জনপদ কি তবে অন্ধকারেই থেকে যাবে, নাকি প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সীতা পাহাড়ের ৬৫টি শিশুর কলকাকলিতে মুখরিত হবে নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এমন বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে অবহেলিত এই জনপদের মানুষ।