ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ-‘বন্ধ হোক ঘুষের রাজত্ব’
কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া: কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে চলছে লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের মহোৎসব। সিসিটিভি থাকা সত্ত্বেও অফিসের প্রবেশ পথে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জালে ফেলে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবা নিতে আসা মানুষ।
অভিযোগের তীর মূলত অফিস সহকারী বেবী রাণী দে এবং তার গড়ে তোলা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সদস্য মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবির দিকে। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার প্রভাব খাটিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলম বিভিন্ন অজুহাতে অফিসে অনিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকা, সঠিক সময়ে অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং নিজের কক্ষে প্রবেশে অনুমতি লাগার মতো আচরণ, পদে পদে অনিয়মের কারণেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে জমির মূল্যের ০.৫ শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে আদায় করেন বেবী রাণী দে। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে ঘুষ দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
তাছাড়া বিভিন্ন সেবার নামে ‘কমিশন’ ও ‘অফিস খরচ’ দেখিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অদৃশ্য ফি-র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-যা পুরো অফিস কার্যক্রমকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
একাধিক সূত্র জানায়, আদায়কৃত ঘুষের ২৫ শতাংশ বেবী রাণী দে নিজে নেন, বাকি ৭৫ শতাংশ সিন্ডিকেটের সদস্য ও দালালদের মাঝে ভাগ করা হয়। দলিল লেখকদের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়, যা সিন্ডিকেটের অংশ বলেই দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও বাজারমূল্য ইচ্ছেমতো কমিয়ে দলিল নিবন্ধন করে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। এ কাজে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বেবী রাণী দে, সৃদুল দাশ, রবিউল্লাহ রবি ও প্রধান কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও দলিলের টিপসই নেওয়া, রশিদ লেখা, মোহরা ও কোর্ট ফি আদায়ের প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেওয়ার প্রথা চালু রয়েছে। এমনকি প্রিন্টিং এর ক্ষেত্রেও প্রতি কাগজে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়।

তাছাড়া এই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ২০ জন দলিল লেখক আছেন। দু-একজন ছাড়া বাকিদের সম্পূর্ণভাবে জিম্মি করে রেখেছে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস। অফিসের চাহিদা পূরণ না হলে ‘গেট পাস’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের তথ্য সরবরাহ করা অপরাধ বলে বেশ কয়েকজন দলিল লেখককে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কোনো কর্মচারী বা দলিল লেখককে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে বা হাঁটতে দেখলে তার জন্য সাব-রেজিস্ট্রার অফিস প্রায় ‘হারাম’ করে দেওয়া হয়।
অফিস সহকারী ও মোহরারের মতো পদে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যে বেবী রাণী দে কোটিপতি বনে গেছেন-এমন অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে মুখে।
অফিস সহকারী বেবী রাণী দে-কে একাধিকবার ফোন করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রবিউল্লাহ রবি শুধু বলেন, এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
এদিকে গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলসান আনোয়ারের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও গ্রাহকদের সেবা বঞ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রমাণ পায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এক কর্মচারী বলেন, দুদক আসার খবর পেয়ে যান সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোরশেদ আলম। কোনদিন তিনি সাড়ে ১১টার আগে অফিসে না আসলেও সেদিন তিনি ৯টার আগে অফিসে আসেন। অফিসের ড্রয়ারে থাকা ঘুষের ৩ লাখ টাকা কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন এবং সবকিছু গুছিয়ে রাখলেও দুদক সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়মের প্রমাণ পায়।
উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলম বলেন, অফিসে প্রবেশে কোনো অনুমতি লাগে না; তবে খাস কামরায় প্রবেশের জন্য অনুমতি প্রয়োজন, কারণ এটি অফিসারের ব্যক্তিগত কাজের স্থান। তিনি আরও বলেন, আমার অফিস সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। এখানে অবৈধ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। যে সকল অভিযোগ উঠেছে তা সত্য নয়। কারো অভিযোগ থাকলে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। আমরা অফিসের কোনো কর্মচারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।
তবে সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, স্বৈরাচার সরকার পরিবর্তন হলেও এখনো স্বৈরাচারিতা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্নীতি যদি এতটাই ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়, তবে প্রশাসন নীরব কেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে সিন্ডিকেট ভেঙে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।












