খালেদা জিয়া আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে গেলেন, হলেন নীহারিকা—যে আলোয় আজ ঝলমল করছে বিএনপি

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন, প্রিয় চট্টগ্রাম: ভূমিধস বিজয়ের পর আজ দেশের শাসনভার গ্রহণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ইতিহাসের এই দিনে একটি নাম উচ্চারিত হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগে—তিনি আজ নেই, কিন্তু এই বিজয়ের রচনায় যার ভূমিকা ছিল সমুদ্রসম, সেই মানুষটি হলেন বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ইতিহাস গড়েছেন, খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেটেছে সংগ্রাম আর আন্দোলনের ভেতর দিয়েই। গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন—সব সহ্য করেছেন; কিন্তু কখনো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি, কখনো আদর্শ থেকে সরে যাননি।
চার দশকের বেশি সময় তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিন দফায় দশ বছরেরও বেশি সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো পরাজয়ের মুখ দেখেননি—এটিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর এক গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসা ছিল অসম্ভবের কাছাকাছি। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে, দলের আহ্বানে ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির দায়িত্ব নেন। সেটিই হয়ে ওঠে বিএনপির রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর নেতৃত্বেই দলটি গণমানুষের শক্তিতে রূপ নেয়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন খালেদা জিয়া। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে। ওই আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় নেতৃত্বের অবিসংবাদিত প্রতীক।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই বিজয়ী হয়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান। জীবনের সবকটি নির্বাচনে যত আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সব কটিতে তিনি জয় লাভ করেন। তাঁর শাসনামলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, নারীর ক্ষমতায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
পরবর্তী জীবনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, একের পর এক মামলা, কারাবাস, নির্বাসনের বেদনা, সন্তান হারানোর শোক এবং দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন হয়ে ওঠে এক অনবদ্য সংগ্রামের ইতিহাস। তবু তিনি ছিলেন অবিচল। একবার বলেছিলেন—
“এই দেশই আমার ঠিকানা। এ দেশের মাটি ও মানুষই আমার সব।”
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর প্রয়াণে একটি অধ্যায় শেষ হলেও শেষ হয়নি তাঁর প্রভাব। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করেছে—তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন গণতন্ত্রের মাতা।
আজ যখন বিএনপি সরকার গঠনের শপথ নিচ্ছে, তখন খালেদা জিয়া নেই—কিন্তু তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও সংগ্রামের আলোতেই পথ চলছে দলটি।
তিনি হয়ে থাকবেন ইতিহাসের সেই নীহারিকা—