কেরুর মদে লাভ হলেও চিনিতে লোকসান কেন?

দেশের সব চিনিকল টানা লোকসানের মুখ দেখলেও বিগত কয়েক বছর ধরে মুনাফা করে এসেছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। তবে চিনিকল হলেও কেরুর মুনাফার মূল জোগান আসে মদ বিক্রি থেকে। মদ থেকে মুনাফা আসলেও বছরের পর বছর চিনিতে কেরুর লোকসানের কারণ কী!

খাদ্য ও চিনিশিল্প করপোরেশনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৯ লাখ ৬৭ হাজার প্রুফ লিটার মদ উৎপাদন করেছে কেরু। মদ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৪৩৯ কোটি টাকা। এখান থেকে রাজস্ব জমা দেয়ার পর কেরুর নিট আয় দাঁড়িয়েছে ১৫২ কোটি টাকা।

এর আগে, ২০২১-২২ অর্থবছরে কেরু ৩৬৮ কোটি টাকার মদ বিক্রি করেছে, যেখান থেকে রাজস্ব জমা দিয়ে ১৩২ কোটি টাকা লাভ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সময় যত এগুচ্ছে মদে কেরুর লাভ ততো বাড়ছে।

এ ব্যাপারে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আশরাফুল আলম ভূঁইয়া সময় সংবাদকে বলেন, ‘একটা সময় মদ থেকেও কাঙ্ক্ষিত লাভ আসতো না। কিন্তু এখন যখন লাভ আসতে শুরু করেছে, তখন এ খাতে সামনে আর কোনো লোকসানের আশঙ্কা নেই।’

মদ থেকে লাভ আসা শুরু করায় কেরু মদের উৎপাদন আগের থেকে অনেক বেশি বাড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেরু ৫৯ লাখ ৬৭ হাজার প্রুফ লিটার মদ উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪২ হাজার গ্রুফ লিটার বিলেতি আর ৩২ লাখ ৮০ হাজার প্রুফ লিটার বাংলা মদ। বাকিটা অন্য ক্যাটাগরির।

এর আগে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মদ উৎপাদন করেছে ৫৩ লাখ ৭৯ হাজার গ্রুফ লিটার। যেখান থেকে মদ বিক্রি হয়েছে ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার প্রুফ লিটার। ২০২০-২১ অর্থবছরে কেরুতে মদ উৎপাদন হয়েছিল ৪২ লাখ ৭০ হাজার প্রুফ লিটার।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেরুর ১ কোটি লিটার পর্যন্ত মদ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে কেরু মোট সক্ষমতার অর্ধেক কাজে লাগায়। দিনকে দিন মদের চাহিদা বাড়ায় এ সক্ষমতা আরও প্রসারিত করার চিন্তাভাবনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির ডিস্টিলারি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক রাজিবুল হাসান সময় সংবাদকে বলেন, গত এক দশক থেকে মদে লাভের মুখ দেখে আসছে কেরু। প্রতি বছর লাভের পরিমাণ বাড়ছে। আগে কেরুর উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ শতাংশ কাজে লাগানো হলেও এখন তা বাড়িয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এটি আরও বাড়ানো হবে।

আগামী দিনে মদ উৎপাদন নিয়ে কেরুর ভাবনা জানতে চাইলে রাজিব বলেন, এরই মধ্যে কেরুর উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বিলেতি মদ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অটোমেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মদ উৎপাদন আরও প্রসারিত করতে তুরস্ক থেকে ব্রয়লার মেশিন আনা হয়েছে। সেটি প্রতিস্থাপনের পর মদ উৎপাদন আরও বাড়বে।
এ যখন কেরুর মদ উৎপাদনের চিত্র, কয়েনের উল্টো পাশে একেবারে ভিন্ন চিত্র চিনি উৎপাদনে। আখের অভাবে দর্শনা চিনিকলে উৎপাদন বন্ধ থাকা প্রতি বছরের নিত্যদিনের ঘটনা। কৃষকরা ন্যায্য দাম না পাওয়ায় একদিকে যেমনি আগ্রহ হারাচ্ছেন আখ চাষে, অন্যদিকে আখের অভাবে দেশের অন্যান্য চিনিকলের মতো দর্শনার কেরু চিনিকলের কার্যক্রমও প্রায়শই স্থবির হয়ে থাকে।

আমাদের জেলা প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৪২ কার্যদিবসের মাথায় আখের অভাবে চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়।

চিনিকল সূত্রে জানা যায়, এ বছর মাড়াই দিবসের আগে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সাড়ে ছয় শতাংশ চিনি আহরণের হার নির্ধারণ করে। ৫৩ কার্যদিবসে ৬২ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার ৮৮৪ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়।

তবে আখের স্বল্পতার কারণে ৪২ দিনে ৪৬ হাজার ৯৩৭ টন আখ মাড়াই করে। এতে করে মোটের ওপর ২ হাজার ২৭০ টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। চিনি আহরণের গড় হার ছিল ৫ শতাংশ। এতে চিনিকারখানা এবারও লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

চিনিতে আদৌ লাভ দেখার সম্ভাবনা আছে কি-না – এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল আলম ভূঁইয়া বলেন, আখের দাম কম থাকায় কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ পান না। চিনিকলগুলোর লোকসানের মূল কারণ এ আখের অভাব। চিনি উৎপাদনের প্রধান এ কাঁচামাল না থাকলে কল বন্ধ রাখতে হয়। সক্ষমতা থাকার পরেও কাঁচামালের অভাবে চিনিকলগুলো লাভ করতে পারে না।

তবে চলতি বছর দাম বাড়ানোয় যেসব কৃষক আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তারা আবার ফিরতে পারেন। এতে করে কাঙ্ক্ষিত কাঁচামাল পেলে সামনের বছরগুলোতে আহামরি লাভ না হলেও লোকসানের ভরাডুবি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে জানান আশরাফুল।

এদিকে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, পাঁচ বছর পর বিগত অর্থবছরে মণপ্রতি আখের দাম বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়েছে। ১৪০ টাকা থেকে পাঁচ বছর পর ১৮০ টাকা দাম বাড়ানোকে যথেষ্ট মনে করছেন না কৃষকরা। আখ চাষি ফেডারেশনের দাবি ছিল, আখের দাম মণপ্রতি ২৪০ টাকা করা।

এক দশক আগের হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৫টি সরকারি মিলে ১ লাখ ২৮ হাজার টন চিনি উৎপাদন হয়েছিল, যা ২০২২-২৩ সালে কমে ২১ হাজার ৩১৩ মেট্রিক টনে নেমে আসে। অর্থাৎ আখের অভাবে এক দশকে চিনি উৎপাদন কমেছে ১ লাখ টনের বেশি।

মূলত যে হারে চিনির দাম বেড়েছে, কৃষকরা তার তুলনায় আখ চাষ করে আশানুরূপ লাভ করতে পারছেন না। কৃষক যে টাকায় আখ বিক্রি করছেন, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে চিনি কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এমন বৈষম্যমূলক দাম নির্ধারণে একদিকে চিনিকলগুলো যেমনি স্থবির হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কৃষক আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

দেশের চিনিকল স্থবির থাকায় বাজার ছেয়ে গেছে আমদানি করা চিনিতে। আমদানি সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রভাবে চিনির দাম এখন আকাশছোঁয়া। শুধু নভেম্বর মাসেই চিনির দাম বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়। কিন্তু বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। দেশের চিনিশিল্প আমদানি নির্ভর হয়ে পড়লে এবং চিনিকলগুলো লাগাতার লোকসান দেখলে, এ শিল্পে শিগগিরই ধস নামবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।